রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচের চিঠি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এসে পৌঁছেছে।
গত বুধবার (৫ জুলাই) ডাকযোগে এই চিঠি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছেছে। রাজশাহী কেন্দ্রীর কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাস আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলম রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। জুনের শেষ সপ্তাহের দিকে রাষ্ট্রপতি তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেন। তবে সেই চিঠি বুধবার রাজশাহী কারাগারে পৌঁছেছে। এখন কারা আইন অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
জেল কোড অনুযায়ী, চিঠি হাতে পাওয়ার ২১ দিন থেকে ২৮ দিনের দিনের মধ্যে যে কোনো দিন ফাঁসি কার্যকর করা হয়। প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচের চিঠি গত বুধবার রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছেছে। তবে ফাঁসি কার্যকরের আগে নানা প্রক্রিয়া রয়েছে। জেল কোড মেনে এখন সে প্রক্রিয়াগুলোই শুরু করতে চায় কারা কর্তৃপক্ষ। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকেই কনডেম সেলে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাবি শিক্ষক তাহের হত্যা: সহযোগী অধ্যাপকের মৃত্যুদণ্ড আপিলে বহাল
এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মিয়া মহিউদ্দিনের পরিবারের কোনো সদস্যের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রীর ভাই ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক নির্ঝর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিম্ন আদালতে দু’জনের মৃত্যুদণ্ডের যে রায় দেওয়া হয়েছিল তাই বহাল থাকে আপিলে, খারিজ হয় রিভিউ আবেদনও। তাই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা ছাড়া আর কোনো পথই খোলা ছিল না তাদের। এরপরও অধ্যাপক তাহের হত্যা মামলায় দণ্ডিত এই দু’জনের ফাঁসি কার্যকর স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে গত ৭ মে ফের রিট আবেদন করেন তাদের স্বজনরা। যদিও উত্থাপিত হয়নি মর্মে পরবর্তীতে সেই আবেদনও খারিজ করে দেন বিচারপতি মো. জাফর আহমেদ ও মো. বশির উল্ল্যার হাইকোর্ট বেঞ্চ।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সর্বোচ্চ আদালতে এই দুইজনের ফাঁসির দণ্ড বহাল থাকা সংক্রান্ত নথিপত্র রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আসার পরপরই কারাবিধি অনুযায়ী আসামিদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে চান কি না। এরপর তারা এই ঘটনায় নিজেদের দোষ স্বীকার প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন। পরে তা নিয়ম মেনে কারা অধিদপ্তরের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েও দেওয়া হয়। তবে রাষ্ট্রপতি তাদের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করেছেন।
আরও পড়ুন: রাবি অধ্যাপক তাহের হত্যায় মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন ড. মহিউদ্দিন
জানা গেছে, ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পশ্চিমপাড়া আবাসিক কোয়ার্টার থেকে নিখোঁজ হন অধ্যাপক তাহের আহমেদ। বাসাটিতে তিনি একাই থাকতেন। কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম তার দেখাশোনা করতেন। ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি বাসাটির পেছনের ম্যানহোল থেকে উদ্ধার করা হয় অধ্যাপক এস তাহের আহমেদের গলিত মরদেহ। ৩ ফেব্রুয়ারি তার ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ রাজশাহীর মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
এদিকে, পুলিশ অধ্যাপক তাহেরের করা একটি জিডির সূত্র ধরে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলমসহ আটজনকে গ্রেফতার করে। এরপর গ্রেফতারদের মধ্যে তিন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তারা বলেন, অধ্যাপক তাহের বিভাগের একাডেমিক কমিটির প্রধান ছিলেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সুপারিশ চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক তাহের তা দিতে অস্বীকার করেন। মূলত পদোন্নতি না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মিয়া মহিউদ্দিন হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
তিন আসামি জবানবন্দিতে আরও বলেন, বালিশ চাপায় হত্যার পর বাড়ির ভেতরে থাকা চটের বস্তায় ভরে অধ্যাপক তাহেরের মরদেহ বাসার পেছনে নেওয়া হয়। মরদেহ গুমের জন্য জাহাঙ্গীর আলম তার ভাই নাজমুল আলম ও নাজমুলের স্ত্রীর ভাই আব্দুস সালামকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ডাঁশমারী গ্রাম থেকে ডেকে আনেন। তাদের সহায়তায় বাসার পেছনের ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে অধ্যাপক তাহেরের মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বাধা নেই
২০০৭ সালের ১৭ মার্চ শিবির নেতা মাহবুব আলম সালেহীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। এ হত্যা মামলার বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক চারজনকে ফাঁসির আদেশ ও দুইজনকে খালাস দেন। দণ্ডিতরা হলেন মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, অধ্যাপক তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম, তার ভাই নাজমুল আলম ও নাজমুল আলমের স্ত্রীর ভাই আব্দুস সালাম। তবে বিচারে খালাস পান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সি।
পরবর্তীতে দণ্ডপ্রাপ্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিল বিভাগ মিয়া মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের রায় বহাল রাখলেও আসামি নাজমুল আলম ও নাজমুল আলমের স্ত্রী ভাই আব্দুস সালামের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। তবে আপিলে সাজা কমে যাবজ্জীবন হওয়া দুই আসামির দণ্ড বৃদ্ধি চেয়ে আপিল করেন রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ই বহাল রাখেন।
সাখাওয়াত হোসেন/এমআরআর/জেআইএম