দেশজুড়ে

যৌবন হারিয়েছে জামদানি, হতাশ ব্যবসায়ীরা

একসময় জামদানি শাড়ির জন্য বিখ্যাত ছিল প্রাচীন বাংলার রাজধানী খ্যাত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ শাড়ির চাহিদা দিনদিন কমে যাচ্ছে। ফলে বেচাকেনাও কমেছে জামদানি শাড়ির। এতে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। রোববার (২৩ জুলাই) দুপুরে সোনারগাঁ জাদুঘরের কারুপল্লিতে বিভিন্ন জামদানি শাড়ির দোকান ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ক্রেতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা অলস সময় পার করছেন। ঘণ্টার ব্যবধানে দু-একজন ক্রেতা এলেও শাড়ি দেখে চলে যাচ্ছেন। কাউকেই কিনতে দেখা যায়নি। জামদানি শাড়ি একসময় গর্বের বস্তু ছিল। এ শাড়ি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। তাঁতিদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় শাড়িতে ফুটে ওঠে বাংলার প্রকৃতি, ফুল, লতা-পাতা, বিভিন্ন প্রাণীর দৃশ্যসহ বাহারি সব নকশা। জামদানি শাড়ির প্রতি নারীদের অন্যরকম ভালোবাসা আছে। বাংলার এক অনবদ্য সাংস্কৃতিক নিদর্শন এ জামদানি শিল্প। ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগলিক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো।

বেশিরভাগ জামদানি শাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জে তৈরি হয়। বর্তমানে অনেক তাঁতি এখান থেকে কাজ শিখে শেরপুরে চলে গেছেন। এখন সেখান থেকেই অনেক জামদানি শাড়ি তৈরি হয়।

আরও পড়ুন: আসল জামদানি শাড়ি চেনার ৩ কৌশল

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগেও প্রতিমাসে শতাধিক শাড়ি বিক্রি হতো। বর্তমানে ৪০-৪৫টি বিক্রি করতেই হিমশিম খেতে হয়। জাদুঘরে অনেক দর্শনার্থী এলেও তারা তাদের দোকানগুলো পরিদর্শন করেই চলে যান।

জাদুঘরের কারুপল্লির জামদানি ঘরের মালিক ওসমান গণি। ৩৫ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন আমাদের বেচাকেনা খারাপ অবস্থায় রয়েছে। এর প্রধান কারণ এখন সব জিনিসপত্রেরই দাম বেড়ে গেছে। সুতা, কারিগরের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে শাড়ির দামও অনেকটা বেড়ে গেছে। আবার প্রত্যেক মানুষেরই নির্দিষ্ট বাজেট থাকে, এ বাজেট ক্রস হয়ে গেলে অনেকেই জামদানি শাড়ির মতো দামি শাড়ি কিনতে চান না। ফলে আমাদের বেচাবিক্রি কম।’

ওসমান গণি জানান, ভালোমানের একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ সময় লাগে। তার দোকানে তিন হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা দামের শাড়ি রয়েছে। এছাড়া অর্ডার করলে এর চেয়ে বেশি দামি শাড়ি তৈরি করে দেওয়া হয়।

ব্যবসায়ীরা জানান, সোনারগাঁ জাদুঘরে নভেম্বর থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেচাকেনা তুলনামূলক ভালো থাকে। বাকি সময়টায় কিছু পাইকারি ব্যবসায়ী রয়েছেন। আবার অনলাইনে যারা ব্যবসা করেন তারা এখান থেকেই শাড়ি কেনেন।

স্বর্ণলতা জামদানি কুটির মালিক আবু তাহের জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৯৭২ সাল থেকে আমি এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে আগের তুলনায় এখন আমাদের বেচাকেনা অনেকটাই কম। বর্তমানে আগের তুলনায় অর্ধেক বেচাকেনাও করা সম্ভব হয় না।’

আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই ব্যবসার খারাপ অবস্থার পরও ছাড়তে পারছি না।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের সিনিয়র গাইড লেকচারার একেএম মুজাম্মিল হক মাসুদ বলেন, সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্য জামদানি শাড়ি। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আমরা সোনারগাঁয়ে একটি বিপণন কেন্দ্র চালু করেছি। এখানে একটি কারুপল্লিও রয়েছে। এখান থেকে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা এ শিল্পকে ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

রাশেদুল ইসলাম রাজু/এসআর/এমএস