দেশজুড়ে

টাকা আসে বিদেশ থেকে, প্রশিক্ষণ মিয়ানমারে

কক্সবাজারের উখিয়ায় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) ওলামা কাউন্সিল কমান্ডার ও অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউনুসকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। এসময় তার কাছ থেকে বিদেশি রিভলবার ও কার্তুজ এবং স্মার্ট ফোন জব্দ করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) রাত ১০টায় উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের তাজনিমার খোলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার ও এসব মালামাল জব্দ করা হয়।

গ্রেফতার আরসা কমান্ডার ইউনুস মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপের বাসিন্দা মৃত হাবিবুল্লাহর ছেলে। বর্তমানে তিনি উখিয়ার চেংখালীর ক্যাম্প ১৯ এর ব্লক-সি/১৩ তে শরণার্থী হিসেবে রয়েছেন।

র‌্যাবের দেয়া তথ্যমতে, আরসার অর্থ সম্পাদক ইউনুস মিয়ানমারে থাকা অবস্থায় মংডু টাউনশিপের মেরুল্লা মাদরাসায় শিক্ষকতা করতেন। ২০১৬ সালে মৌলভি আরিফুল্লাহর মাধ্যমে আরসায় যোগ দেন। তিনি আরসার আমির আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনী, ওস্তাদ খালেদ, সমিউদ্দিনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলেম-ওলামা, হেডমাঝি, সাবমাঝি ও সাধারণ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বৈঠক করে আরসা সংগঠনে যোগদানের জন্য উৎসাহ দিতেন।

তার বরাত দিয়ে আরসার টাকার উৎস সম্পর্কে র‌্যাব সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, আরসার কার্যক্রমের জন্য প্রতিমাসে সৌদি আরব থেকে আবুল বশর এক লাখ টাকা, মৌলভী ইসমাইল এক লাখ টাকা, পারভেজ ১৫ হাজার টাকা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জহুর আলম এক লাখ টাকা, মালয়েশিয়া থেকে হারুন এক লাখ টাকা, থাইল্যান্ড থেকে হারুন ৬৫ হাজার টাকা এবং সৌদি আরব থেকে মো. ইসলাম প্রতিবছর এক লাখ টাকাসহ মোট পাঁচ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাঠান।এছাড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে অজ্ঞাতপরিচয় রোহিঙ্গা টাকা পাঠান।

তিনি আরও জানান, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিমাসে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকা আরসার ক্যাম্প জিম্মাদারদের কাছে আসে। এ টাকা দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় ও দলের সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা, বেতন দেওয়া হয়। বর্তমানে মাওলা ইউনুসের কাছে তার বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৩৩-৩৭ হাজার টাকা রয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে ইউনুস আরও জানিয়েছেন, সংগঠনের জন্য গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে আরসা সমর্থিত বিভিন্ন গ্রুপ, ব্যক্তি ও সংগঠন থেকে প্রায় ১৩ লাখ ৮১হাজার ৬৯৫ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

গ্রেফতারের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানায়, আরসাতে ২০০-২৫০ জন সদস্য রয়েছেন। তারা ২০১৬ সালে মিয়ানমারে থানায় আক্রমণ করে ৭০টি একে-৪৭ অস্ত্র লুট করেন। আরসা সদস্যরা অস্ত্রগুলো ক্যাম্পে নিয়ে আসার পর ক্যাম্প-৬ এর সমিউদ্দিন ও ক্যাম্প-১৭ এর হোসেনের কাছে জমা রাখেন। পরে তা বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেওয়া হয়।

ইউনুসের বরাতে র‌্যাব জানিয়েছে, আরসা সন্ত্রাসী সমিউদ্দিন ও যোবায়ের ককটেল বোমা বা বিস্ফোরক তৈরি করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশীয় তৈরি এলজি অস্ত্রের চাহিদা বেশি। আরসা সদস্যরা অস্ত্র ক্রয় করার পর নগদ অর্থ হাতে হাতে লেনদেন করেন অথবা বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করেন। মিয়ানমারের বুথিডং ও মন্ডু শহরের বিভিন্ন ছোট ছোট পাহাড়ে ওস্তাদ খালেদ, সামসু এবং হামিদ হোসেন আরসা সদস্যদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। আরসা সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কার্তুজ বরাদ্দ নেই। তবে বিভিন্ন অপারেশনের আগে বেশি করে কার্তুজ দেওয়া হয়।

র‌্যাব ১৫ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুস সালাম চৌধুরী বলেন, গ্রেফতার আরসা কমান্ডারের কাছ থেকে আরসা সদস্যদের বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দ পাওয়া গেছে। তাছাড়া তার দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে আরসার কাছে অন্তত ২০টি টাইপ-৭৪ এলজি, জেআরজি অস্ত্রসহ ও বিপুল পরিমাণে হাত বোমা (হ্যান্ড গ্রেনেড) রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ইউনুসের বিরুদ্ধে উখিয়া থানায় হত্যা, পুলিশ অ্যাসল্ট ও অগ্নিসংযোগের পাঁচটি মামলা রয়েছে। এরমধ্যে ২০২২ সালের ১৫ অক্টোবর হেডমাঝি আনোয়ারকে কুপিয়ে হত্যা, ২০২৩ সালের ৩ মার্চ রোহিঙ্গা মোহাম্মদ রফিকে গুলি করে হত্যা, ১৩ মার্চ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আগুন লাগানো, ১১ এপ্রিল এবং ৯ জুন এপিবিএনের ওপর হামলার মামলা অন্যতম।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন আরসা নেতা ইউনুস। তার মধ্যে অন্যতম হলো ২০২১ সালে ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৮ এর একটি আবাসিক মাদরাসায় অবস্থানরত ছয়জন ছাত্র-শিক্ষক হত্যা, ২০২৩ সালের ৩ মার্চ ইসলামী মাহাযের নেতা রফিক এবং ১৮ মার্চ ইসলামী মাহাযের নেতা হাফেজ মাহবুবকে হত্যা।

সায়ীদ আলমগীর/এসআর/এএসএম