জাতীয়

জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হচ্ছে মেধাবীরা

দেশে জঙ্গিবাদের জালে দিন দিন আটকা পড়ছে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মেধাবী শিক্ষার্থীরাও। ইসলামী বিপ্লবের নামে বিপুলসংখ্যক মেধাবী তরুণ জঙ্গিবাদের খুন আর ধ্বংসের রাজনীতিতে নিজেদের জড়াচ্ছে। এজন্য তারা আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করে গা ঢাকা দিয়ে থাকছে। এমনকি অনেকে নিজের পরিবারের কাছেও এমন রাজনীতির বিষয়টি আড়াল করছে। দেশে এক সময় কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তরুণরা জঙ্গিবাদের কার্যক্রমে জড়িত থাকলেও এখন এর বিস্তার ঘটেছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। সম্ভ্রান্ত, উচ্চবিত্ত, আধুনিক, ক্ষমতাধর পরিবারের কৃতী সন্তানরা দেশের ঐতিহ্যবাহী স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে জঙ্গিবাদের আদর্শকে গ্রহণ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের সচেতন মহল। দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গোপনে জঙ্গিবাদি রাজনীতির যে চর্চা চলছে তা দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপর হওয়া দরকার।স্বাধীনতাপরবর্তী সময় থেকে খুব ক্ষুদ্র পরিসরে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম ছিল মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। যেখানে বেশিরভাগ ছাত্রই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পালাবদলে ধর্ম নিয়ে রাজনীতির প্রসার ঘটে বাংলাদেশে। ইসলামী বিপ্লব বাস্তবায়নে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেয় কওমি মাদ্রাসার অনেক শিক্ষার্থী। নিজেদের আদর্শ বাস্তবায়নে তারা বিরুদ্ধ শক্তিকে বিনাশে হত্যার পথ বেছে নেয়। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ থেকে রাষ্ট্রের বিচ্যুতি জঙ্গিবাদের রাজনীতিতে আরও রসদ জোগায়। যার ক্রমবিকাশের বিস্ফোরণ ঘটে চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে। সারাদেশে একই দিনে বোমা বিস্ফোরণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বোমা হামলা, আদালত প্রাঙ্গণে হামলা, বিচারক হত্যা, বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমানের উত্থান এবং জঙ্গি কার্যক্রম রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পরে সরকারের ব্যাপক তৎপরতায় জঙ্গিরা সাংগঠনিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়, রাজপথ বা মাঠে তাদের প্রকাশ্য কার্যক্রমও তেমন নেই। কিন্তু গোপনে তাদের তৎপরতা যে অব্যাহত রয়েছে তা তারা মাঝে মধ্যেই জানান দেয়। বিচ্ছিন্ন এই কার্যক্রমে সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া জঙ্গিদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। আর তারা উচ্চবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থী। প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও বিত্তশালীদের সন্তানরাও ঝুঁকে পড়ছে এসব জঙ্গিবাদের দিকে। সাবেক বিচারপতির সন্তান থেকে শুরু করে একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজারও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার তথ্য মিলেছে। কথিত জিহাদের স্বপ্ন দেখিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে মগজ ধোলাই করে কৌশলে এসব উচ্চশিক্ষিত যুবকদের ভেড়ানো হচ্ছে নিষিদ্ধ সংগঠনে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোতে আধ্যাত্মিক ও শীর্ষ নেতা হিসেবে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতরাই রয়েছেন। এরমধ্যে হিযবুত তাহরীর সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণকে তাদের কার্যক্রমে ঢুকিয়েছে। এসব নিষিদ্ধ সংগঠন শিক্ষার্থীদের দিয়ে তৈরি করছে কিলিং স্কোয়াড, বোমা স্কোয়াড, সুইসাইডাল স্কোয়াড ও স্লিপার সেলের মতো গ্রুপ। মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর এমন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় ভাবিয়ে তুলেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদেরও। তারা বলছেন, অভিজাত পরিবারের উচ্চশিক্ষিত সন্তানদের জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া উদ্বেগ ও শঙ্কার বিষয়। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এক সময় কিছু মাদ্রাসাকেন্দ্রিক জঙ্গি কার্যক্রম থাকায় তা জনমানুষকে তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি। উল্টো জনগণই তাদের প্রতিরোধ করেছে। আর প্রভাবশালী পরিবারগুলোর উচ্চশিক্ষিত ছেলেরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে প্রচারণা চালালে সহজেই তা গণমানুষকে প্রভাবিত করবে। তবে সরকারের জঙ্গিবিরোধী মনোভাব এবং জঙ্গি গ্রুপে ভিড়ে যাওয়া উচ্চশিক্ষিতদের সংখ্যা এখনও অনেক কম থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ নিয়ে তেমন ভয় পাচ্ছে না।উচ্চশিক্ষিত তরুণদের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা : গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজা সাদ আল নাহিন। যিনি আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের কিলিং স্কোয়াডের সদস্য। নাহিন তার সহযোগীদের নিয়ে ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। একই বছরের মার্চ মাসে গ্রেফতারের পর ওই ঘটনায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় সাবেক এক বিচারপতির ছেলে আসিফ আদনানকে। এরপরই তার দেওয়া তথ্যে গ্রেফতার করা হয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সামিউন রহমান ওরফে ইবনে হামদানকে। সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা হামদানের বাবা-মাও ব্রিটেনের নাগরিক। ওই দু`জনকে গ্রেফতারের পর সংবাদ সম্মেলনে ডিবি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, `তারা আল কায়দা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির ভিডিওবার্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে তুরস্ক ও সিরিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তারা কথিত জিহাদে অংশ নিয়ে দেশে ফিরে তাদের নিজস্ব মতবাদ প্রচার করতে চেয়েছিল।`গত ৫ নভেম্বর ডিবি পুলিশ গ্রেফতার করে আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের মিডিয়া শাখার প্রধান মোরশেদ আলমকে। মোরশেদ ২০১১ সালে ইস্ট-ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার হন। তার ধনাঢ্য বাবা-মা আমেরিকা প্রবাসী। ১১ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয় বাংলাটিমের মিডিয়া শাখার অপর সদস্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ ওয়াদুদ জুম্মন ওরফে সাইফুলকে। তার বাবা রাজধানীর একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক। মা ঢাকার একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক। ওয়াদুদের দুই বোনও চিকিৎসক।নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদে (হুজি) এর আগে মাদ্রাসার ছাত্রদের দেখা গেলেও গোয়েন্দা পুলিশ সম্প্রতি গ্রেফতার করে প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের ছাত্র ওমর ওরফে ফয়জুলকে। যিনি নিষিদ্ধ সংগঠনটির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই ওমর হুজির দুটি বিস্ফোরক ল্যাবের দায়িত্বেও ছিলেন। এর আগে গত ১৮ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় জেএমবির সক্রিয় জঙ্গি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া সিকান্দার আলী ওরফে নকিকে। তার বাবা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বার কাউন্সিলের সভাপতি ছিলেন। সূত্র: সমকাল