২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ভাইয়ের, সন্তানের রক্তমাখা সেই দুপুর কোনো রক্তচক্ষুর ভয়ে এক দিনের জন্যও ভুলবে না বাঙালি জাতি। শহীদ বরকতের রক্তমাখা শরীর দেখে এই সাহসী উচ্চারণটি প্রথম করেছিলেন এক তরুণ। কবিতার খাতায় লিখেছিলেন_ `আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী/আমি কি ভুলিতে পারি`। সেই দিনের ১৮ বছর বয়সী তরুণ কবি আবদুল গাফফার চৌধুরী আজ পা দিচ্ছেন ৮১ বছরে। আজ শুক্রবার তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী।গাফফার চৌধুরীর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার বাংলা একাডেমি ও গাফফার চৌধুরীর জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি জাতীয় সংবর্ধনা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আজ বিকেল ৩টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। দেশের বিশিষ্ট লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক-সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি গাফফার চৌধুরীকে শুভেচ্ছা জানাবেন।সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের মহাপরিচালক মোনায়েম সরকার।বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান হয়। এতে বক্তব্য দেন জাতীয় সংবর্ধনা কমিটির সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, কবি আসাদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের মহাপরিচালক মোনায়েম সরকার প্রমুখ।১৯৩৪ সালের আজকের এই দিনে (১২ ডিসেম্বর) বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়ার চৌধুরী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। তার বাবা হাজী ওয়াহিদ রেজা চৌধুরী ও মা জহুরা খাতুন। ১৯৫০ সালে গাফফার চৌধুরী পরিপূর্ণভাবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ সময়ে তিনি `দৈনিক ইনসাফ` পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মহিউদ্দিন আহমদ ও কাজী আফসার উদ্দিন আহমদ তখন দৈনিক ইনসাফ" পরিচালনা করতেন। ১৯৫১ সালে `দৈনিক সংবাদ` প্রকাশ হলে গাফফার চৌধুরী সেখানে অনুবাদকের কাজ নেন। এরপর তিনি বহু পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন।মাসিক সওগাত, দিলরুবা, মেঘনা, ইত্তেফাক, আজাদ, জেহাদ ও পূর্বদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন বরেণ্য এই সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সপরিবারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছান। সেখানে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয়বাংলায় লেখালেখি করেন।এ সময় তিনি কলকাতায় দৈনিক আনন্দবাজার ও যুগান্তর পত্রিকায় কলামিস্ট হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দৈনিক জনপদ বের করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলজিয়ার্সে ৭২ জাতি জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যান। দেশে ফেরার পর তার স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে কলকাতা নিয়ে যান। সেখানে সুস্থ না হওয়ায় তাকে নিয়ে ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনে যান। এরপর তার প্রবাস জীবনের ইতিহাস শুরু হয়। প্রবাসে বসে এখনও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন গাফফার চৌধুরী ।সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশী’সহ তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়া তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন। এর মধ্যে আছে ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’, ‘একজন তাহমিনা’ ও ‘রক্তাক্ত আগস্ট’।তার কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন গাফফার চৌধুরী। ১৯৬৩ সালে ইউনেস্কো পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া বাংলা একাডেমি পদক, একুশে পদক, শেরেবাংলা পদক, বঙ্গবন্ধু পদকসহ আরও অনেক পদকে ভূষিত হয়েছেন।