সপ্তাহে দুইদিন খোলা থাকে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মায়ানী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ২০১২ সালে মায়ানী ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া এলাকায় এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর আশপাশের গ্রামের চিকিৎসার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে এটি। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দরিদ্র মানুষের ভরসাস্থল ছিল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। চার-পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে মানুষ এখানে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসতেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গত সাত-আট বছর ধরে কোনো সেবা পাচ্ছে না তারা। এক সময় দৈনিক শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এখন অনেক সময় এসে কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় লোকজন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা দ্রুত আগের মতো যেন সপ্তাহে ছয়দিন চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয় সেই দাবি করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মায়ানী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে একজন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার, একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, একজন পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক, একজন আয়া, একজন নৈশপ্রহরী ও তিনজন মাঠকর্মী থাকার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সে জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার ও নৈশ প্রহরীর পদ খালি রয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সকাল ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত বসে ধেকে দেখা গেছে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটির মূল ফটকে তালা ঝুলছে। ভবনের সব জানালার কাঁচ ভাঙা। চারপাশে জঙ্গলে ভরে গেছে, দেখার যেন কেউ নেই। সীমানা প্রাচীর নেই। দরজার গ্রিলে মরিচা ধরেছে। এছাড়া নলকূপ থাকলেও তাতে পানি ওঠে না। কেন্দ্রের সামনে কয়েটি গরু বাঁধা রয়েছে।
শামসুদ্দীন নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, এক সময় এই হাসপাতালে অনেক মানুষ আসত। এখন তেমন দেখি না। হাসপাতালে ডাক্তার কখন, আসে কখন যায় সেটাও দেখি না।
জিয়াউল হাসান নামে ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, অব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অভিভাবকহীন। যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত দুইজন চিকিৎসক ও কিছু কর্মী থাকার কথা, সেখানে ঠিকমতো কেন্দ্রটি খোলা হয় না। ইউনিয়নের মানুষ যেন দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারে সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ আশা করছি।
মায়ানী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শিকা রাজিয়া সুলতানা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র সপ্তাহে দুইদিন খোলা থাকে এটা সঠিক না। আমাকে সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার মঘাদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সোমবার ও বৃহস্পতিবার দুইদিন চারটি স্যাটেলাইট ক্লিনিকে দায়িত্ব পালন করি। রোববার ও বুধবার আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করে থাকি। অনেক রোগী সেবা পেয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চারপাশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও ভবনের মেরামতের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা তো স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে বাড়িতে চলে যাচ্ছি না। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গেলে তো এটি বন্ধ রাখতে হবে। কাজ শেষে যখন আসি, তখন তো রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকি।
পরিবারকল্যাণ পরিদর্শক রয়েল বড়ুয়া বলেন, আমার কাজ হলো মাঠে। মাঠপর্যায়ে কাজ বণ্টন করা, মাঠকর্মীরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা দেখভাল করতে হয়। অফিসে এসে শুধু হাজিরা খাতায় নাম লিখে মাঠে চলে যাই।
মায়ানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির আহম্মদ নিজামী বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণে স্থান নির্বাচন ভুল ছিল। কেন্দ্রটি বাইরে হয়ে গেছে। যদি আবুতোরাব বাজার কেন্দ্রিক হলো তাহলে অনেক ভালো হত। তিনি আরও বলেন, ডাক্তার ও দায়িত্বে থাকা লোকজন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত না থাকার বিষয়টি আমিও শুনেছি।
মিরসরাই উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শাহ মো. নূর বলেন, মায়ানী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের ভবনের মেরামত ও সীমানা প্রাচীরের জন্য আমরা একটি প্রস্তাবনা স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে পাঠিয়েছি। অনুমোদন হয়ে গেছে, ফাইল এখন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। আশা করছি, কিছুদিনের মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ ও চিকিৎসক না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ওখানে তো দায়িত্বরত একজন বাসা নিয়ে থাকেন। বাইরে থাকার সুযোগ নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রও বন্ধ থাকার কথা নয়। আমি বিষয়টি খোঁজ-খবর নিয়ে দেখছি।
এম মাঈন উদ্দিন/এমআরআর/এএসএম