ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে রাঙ্গামাটির দশটি উপজেলার মোট ৪৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১৮০ প্রার্থী। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র সংখ্যা অধিক। প্রায় ইউনিয়নে রয়েছে আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর ছড়াছড়ি। তবে জেএসএস সমর্থিত প্রার্থীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে জেএসএস সমর্থিত প্রার্থী জীবতলী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান সুদত্ত কারবারী এবং মগবান ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চাকমা একক প্রার্থী হওয়ায় বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে। এছাড়া কোনো কোনো ইউনিয়নে অপর আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ সমর্থিতরাও স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে সবকটিতে প্রার্থী দিতে পারেনি শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং বৃহৎ দল বিএনপি। আওয়ামী লীগ ১৮ এবং বিএনপি ২৯ ইউনিয়নে কোনো প্রার্থী দিতে পারেনি। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের হুমকি-ধামকি ও বাধার মুখে অনেক ইউনিয়নে তাদের কেউ মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন উভয় দলের দায়িত্বশীল নেতারা। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন জানান, রোববার শেষ দিনে জেলার দশটি উপজেলার মোট ৪৯টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ১৮০ প্রার্থী। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র ১২১টি, আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকা ৩১টি, বিএনপির ধানের শীষে ২০টি, জাতীয় পার্টির লাঙ্গলে পাঁচটি এবং ইসলামী আন্দোলনের তিনটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। এদিকে, খোদ জেলার সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের কোনোটিতেই নৌকা প্রতীকে প্রার্থী দিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এছাড়াও ১৩টি ইউনিয়নে নৌকার কোনো প্রার্থী নেই। জেলা আওয়ামী লীগ অভিযোগ করে বলেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক দল জেএসএস ও ইউপিডিএফের বাধা ও হুমকি ধামকির মুখে প্রায় ইউনিয়নে দলীয় প্রতীক নিয়ে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেউ প্রার্থী হতে সাহস পাননি। ফলে ১৮টি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী শূন্য। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার জাগো নিউজকে জানান, ২৩ এপ্রিলের ইউপি নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের হুমকির কারণে আওয়ামী লীগের বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যানরা দলীয় সমর্থনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দলীয় প্রতীক নিয়ে কাউকে নির্বাচন করতে দেয়া হবে না বলে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের কথার বাইরে কেউ নির্বাচন করলে অন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও হুমকি দিয়েছে তারা। ফলে ৪৯টির মধ্যে ১৮ ইউনিয়নে দলীয় প্রতীক নৌকায় কেউ প্রার্থী হতে সাহস করেনি। তিনি আরো জানান, নির্বাচন এলেই পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো খুব তৎপর হয়ে ওঠে। এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা সফল হয়। বিগত জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচনেও এভাবে জয়ী হয়ে তাদের মধ্যে আরো দুঃসাহস ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে যে, অস্ত্রের জোরে জয়লাভ করা খুবই সহজ। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় তারা তেমন প্রভাব বিস্তার করতে না পারলেও দূরবর্তী ও দুর্গম পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকায় অস্ত্রের জোরে তারা প্রায় শতভাগ সফল হয়ে আসছে। এজন্য নির্বাচনের সময় হলে তারা পাহাড়ি অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বেশি অস্ত্রবাজি চালাতে উৎসাহী হয়ে থাকে। ফলে রাঙ্গামাটিতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তিনি সুষ্ঠু ও অবাধ ইউপি নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনের আগে পার্বত্য এলাকা হতে যাবতীয় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তিনি।জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুছা মাতব্বর জানান, জেএসএস ও ইউপিডিএফের বাধা ও হুমকি-ধামকিতে আমরা দশটি উপজেলার সবকটিতে নৌকায় প্রার্থী দিতে পারিনি। কেবল ৩১টি ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী দেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি ১৮টি ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হয়েছি।একই পরিস্থিতির কারণে নৌকার পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে সবগুলো ইউনিয়নে প্রার্থী দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এদিকে, রাঙ্গামাটিতে আসন্ন ইউপি নির্বাচন মোটেও সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, এখানে যে কোনো নির্বাচনে ‘জোর যার দখল-প্রভাব তার’ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এবার ইউপি নির্বাচনে ধানের শীষে কেবল ২০ চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া সম্ভব হয়েছে। বাকি ২৯ ইউনিয়নে অন্য দলগুলোর জোর মোকাবিলায় শক্তিশালী অবস্থান থাকায় দলীয় মনোনয়ন দেয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে কাউকে বাধা বা হুমকি দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস কেন্দ্রীয় সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা জাগো নিউজকে জানান, জেএসএস সব সময় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। আর সেই বিশ্বাসে তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জেএসএসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে কাউকে প্রার্থী হওয়ার বাধা বা হুমকি দেয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জেএসএসকে বেকায়দায় ফেলতে ও অসৎ উদ্দেশ্যে এমন মিথ্যা অভিযোগ করা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন সজীব চাকমা।সুশীল প্রসাদ চাকমা/এআরএ/এবিএস