জাতীয়

শোকে কাতর রুবিনার চোখে আর পানি আসে না

‘একে একে মিজানুর, এনামুল ও সর্বশেষ বিল্লাল চলে গেলেন না ফেরার দেশে। একেকটা মৃত্যু একেকটা পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে। এ যেন হাতের মুঠোয় মৃত্যু নিয়ে জীবিকার জন্য হাহাকার। মৃত্যুকে পরোয়া না করে মা-বাবা, স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে অসময়ে পাঠ চুকিয়ে জীবিকার পথে পা বাড়িয়েছে বিল্লালদের মতো হাজারো যুবক। কতোজনই যে এভাবে ঝরে যায় কতোজনই বা খোঁজ রাখেন।সোমবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দীর্ঘ ২৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা গেলেন বিল্লালও। বিল্লাল রাজধানীর শ্যামপুর বালুর মাঠ সংলগ্ন ৮ নম্বর টিনসেড বাড়িতে ‘হালিম মলডিং ওয়ার্কশপ’ নামে একটি কারখানায় কাজ করতেন। গত ১২ মার্চ বিকেলে কারখানাটিতে গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায়। এতে পুরো টিনশেড বাড়িটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে।শুধু বিল্লাল নন হাউড্রলিক ওয়েল সিলিন্ডার বিস্ফোরণে কারখানাটির আরও ৪ জন দগ্ধ হন। এরা হলেন এনামুল (২৮), মিজানুর রহমান (১৮), মজিবুর রহমান (২৭) ও রুবেল (২৬)। ওই সময় বিকেলেই দগ্ধ সবাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে বিল্লাল সোমবার রাতে মারা যান। এর আগে মিজানুর ও এনামুলও মারা গেছেন।বিল্লালের ছোট ভাই জিলানী জাগো নিউজকে বলেন, “কী করমু বাই! বাই যে আমাকে বিপদে ফালায়া চইলা গেলো। এডা ছেলে ও এডা মেয়ের বাপ বিল্লাল ভাই। ভাবি আর এই নিষ্পাপ বাচ্চাদের নিয়া আমি কই যামু। মেডিকেল থেকে পুলিশও লাশ লইতে দিতেছে না। ২৪ দিনের ভোগান্তি আর পেরেশানির পর পুলিশের এমন আচরণ। আমাগো গরিব দেইখা ভাই এমন অয়! কারখানার মালিক কহনো আইলো না বিল্লাল বাইকে দেখতে। উল্টা থানায় অভিযোগ দিয়া রাখছে। যাতে কইরা আমাগো কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে না হয়। গরিবের এসব দেখনোর কেউ কি নাই বাই। কিছু লেহেন ভাই। কিছু লেহেন। এতিম পরিবার ডা লইয়া কই যামু বাই!”স্ত্রী রুবিনার চোখ যেন পাথর। ছেলে নূর হোসেন (৮) ও মেয়ে নূরতাজকে (১০) জানানোর ভাষা নেই রুবিনার, তোদের বাবা যে আর বেঁচে নেই। ভাষাহীন রুবিনার চোখের নিচেপড়া কালি বলে দিচ্ছে কতো রাত ঘুম হয়নি তার। মা পেয়ারা বেগম মূর্ছা যাচ্ছেন আর বলছেন, “আল্লাহ তোমার এ কেমন বিচার! এই এতিম বাচ্চা দুইডার আমি এখন কী কইরা মানুষ করমু। এ কেমন শাস্তি দিলা।”বিল্লালের মৃত্যুর খবরে হাসপাতালে ছুটে আসেন দুলাভাই আব্দুল ওয়াহেদ। তিনি জানান, কেরাণীগঞ্জের বছিলা মধ্যের চর বিল্লালদের বাড়ি। বিল্লাল প্রায় ৬/৭ বছর ধরে ‘হালিম মলডিং ওয়ার্কশপ নামক ওই কারখানায় কাজ করতো। জিএসপি ফ্যানের কাজ করতো বিল্লাল। কাজের সময়ই গ্যাসের সিলিণ্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে পুড়ে যায় বিল্লাল। ঢামেক হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, বিল্লালের ৪৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জরুরি মেডিকেল অফিসার ডা. মামুন জানান, ৪৮ শতাংশ দগ্ধ রোগীরা সাধারণত বাঁচেন না। আশঙ্খাজনক অবস্থায় বিল্লালকে এখানে ভর্তি করানো হয়েছিল। পরে আইসিইউ-তেও স্থানান্তর করা হয়। তবে সর্বশেষ চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যান বিল্লাল।জেইউ/বিএ