জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার (লিগ্যাল এইড) অসামাঞ্জস্যতা ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেছেন, লিগ্যাল এইড কমিটিতে বিচার বিভাগের প্রাধান্য নেই, এখানে সবাই আমলা।
জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৪ উপলক্ষে সুপ্রিম কোর্টের অডিটোরিয়ামে লিগ্যাল এইড কমিটি আয়োজিত স্মার্ট লিগ্যাল এইড, স্মার্ট দেশ-বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ এবং উচ্চ আদালতে স্মার্ট আইনি সেবার প্রসার শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মঙ্গলবার (১৪ মে) সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার, আইনের চোখে সমতা এগুলো সবই মানুষের মৌলিক অধিকার। দেশের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলায় অসচ্ছল বিচার প্রার্থীরা বিনা খরচে বিনা ভোগান্তিতে প্রয়োজনীয় আইনি সেবা পাচ্ছেন। এজন্য সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডকে ধন্যবাদ।
প্রধান বিচারপতি বলেন, জাতীয় আইনগত সহায়তা কমিটি গঠনের কার্যাবলি আমি যতটুকু দেখলাম, কমিটিতে কারা কারা থাকবেন সেটা বলা আছে। প্রধান বিচারপতির কোনো প্রতিনিধি সেখানে নেই। রেজিস্ট্রার জেনারেল সেখানের সদস্য, কিন্তু তিনি সেখানে পদাধিকার বলে। আমার দেওয়ার না দেওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। আবার সব সচিবরাও আছেন। আরও দুইজন আছেন যাদের সংসদের স্পিকার মনোনিত করবেন। লিগ্যাল এইড আইনি সেবায় সেখানে প্রধান বিচারপতির কোনো রোল নেই।
তিনি বলেন, আর সুপ্রিম কোর্টে যে লিগ্যাড কমিটি আছে, সেটা কার অধীন, কার সঙ্গে কাজ করে। এখানে প্রধান বিচারপতি নমিনেটেড করবেন একজনকে তিনি এর সভাপতি হবেন। তিনি কে? তিনি হবেন হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, তার সঙ্গে কে থাকবেন সেটাও বলা আছে। কিন্তু তিনি কার কাছে জবাবদিহি করবেন জাতীয় আইনগত সহায়তার কাছে নাকি প্রধান বিচারপতির কাছে? এ বিষয়গুলো এলামনি আছে।
প্রধান বিচারপতি এ পর্যায়ে ভারতের সফর করার প্রসঙ্গে বলেন, কিছু দিন আগে আমরা ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে একটি সম্মেলনে ভারতের নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টকে তথা জুডিশিয়ারিকে ৪০০ ভাগ বেশি বাজেট দিয়েছি। যেখানে ১০০ কোটি ছিল, সেখানে ৪০০ কোটি দিয়েছি।
তিনি বলেন, বাজেট যদি না থাকে আপনি যাই বলেন, কিছু করতে পারবেন না। ক্ষুধা যখন লাগে তখন কিন্তু ক্ষুধাই লাগে। তখন কিন্তু পেট চো চো করে। আপনি লিগ্যাল এইড দিচ্ছেন যে আইনজীবী আমাদের এই সহায়তা দিচ্ছেন তাকে কি আমরা সামান্য কিছু দিতে পাচ্ছি।
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির সাবেক তিনজন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে জানলাম, বাজেট অনেক কম। মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। একটা অনুষ্ঠান করতে গেলে বেশি টাকা খরচ করা যাবে না, তাতে বাধা দেয়। বাজেট যদি কম থাকে, তাহলে কেমন করে কাজ করবে।
এসময় তিনি ভারতের জাতীয় আইনগত সহায়তা (ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিস অথোরিটি) সংস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানের প্রধান হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি, আর তার প্রধান নির্বাহী হচ্ছেন প্রধান বিচারপতির নমিনেটেড একজন। সিনিয়র ডিস্ট্রিক জাজরা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। বাজেট কিন্তু সরকার থেকে আসে। সবখানে কিন্তু বিচার বিভাগের প্রাধান্য।
তিনি বলেন, আমরা দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তৈরি করলাম। এ কমিশনের প্রধান ছিলেন একজন বিচারপতি। তারপর থেকে কী হলো। তারপর যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
মানবাধিকার এবং আইনগত জাতীয় সহায়তা এসব যা আছে তা নিয়ে সরকারকে অনেক অনেক বেশি ভাবতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মানুষের দৌরগড়ায় যদি আপনি পৌছাতে চান, মানুষের জন্য যদি আইনগত সহায়তা পৌছাতে চান তাহলে অবশ্যই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের প্রতিটি বেঞ্চ যদি মাসে কমপক্ষে একটি করে এবং আপিল বিভাগ যদি মাসে কমপক্ষে দুটি করে লিগ্যাল এইডের মামলা নিষ্পত্তি করে তাহলে সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইডের মামলা খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হবে।
বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু তার জীবনে ক্ষমতা নয়, সমতা চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন সমতা কাকে বলে। আমরা সেই সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি কিন্তু আজও আমরা সেই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি।
তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জায়গা থেকে সমতার মধ্যে থাকার চেষ্টা করা। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে মোরালিটির যে অভাব সেটা ইম্প্রুভ করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টে লিগ্যাল এইড অফিসার ও বিচারক ফারাহ্ মামুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বের বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নাইমা হায়দার স্মার্ট লিগ্যাল এইড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইনজীবীদের মন-মানসিকতার পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
আইনি সেবাকে আরও সহজ ও যুগোপযোগী করতে স্মার্ট জুডিসিয়ারির বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনালের মো. গোলাম রব্বানী।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট (উভয়) বিভাগের বিচারপতি, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ (এ এম) আমির উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক শাহ মঞ্জুরুল হক, সুপ্রিম কোর্টের লিগাল এইড কমিটির প্যানেল আইনজীবী, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিচালক মোহাম্মদ আল মামুন ও সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মকর্তারা।
এফএইচ/এমআইএইচএস/এমএস