‘ক্ষুধার সমস্যা মেটাতে খাদ্য নিরাপত্তায় নজর দিতে পারি না’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেছেন, ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা সমাধানে খাদ্য নিরাপত্তার দিকে নজর দিতে পারি না। শনিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) উদ্ভিদ প্রজননবিদদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ প্রজনন ও কৌলিতত্ত্ব সমিতি’ এবং শেকৃবির যৌথ উদ্যোগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক এবং ১২তম দ্বি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গবেষণার মাধ্যমে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন এবং সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমান এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে প্রতি বছর ফসলের প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে। এই ক্ষতি লাঘব করার জন্য বিজ্ঞানীরা ফসলের পীড়নসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নানা রকম মলিক্যুলার প্ল্যান্ট ব্রিডিং কৌশল আবিষ্কার করে চলেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনায় রেখে জেনেটিক্যালি মডিফাইড বিভিন্ন জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে সব সময়ে, সব মাটিতে আমরা ফসল পাবো।
তিনি বলেন, আমাদের ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষিপণ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে, যেটি অবশ্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্যমাত্রা। আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব খুবই বেশি, যে কারণে ভারত থেকে আমাদের আমদানি করতে হয়। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় আমাদের জিনিসপত্রের তীব্র প্রয়োজনীয়তা। ঢাকাতেই প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৬০ হাজার মানুষ বাস করে। আমাদের বার্ষিক জন্মহার ১ দশমিক ২ শতাংশ, অন্যদিকে থাইল্যান্ডে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
আরও পড়ুন>>ব্রয়লার মুরগি-ডিমের দাম আরও বেড়েছে, ঊর্ধ্বমুখী মাংসও
আমাদের বেশিরভাগপ কৃষিপণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। শুধু শাকসবজি ছাড়া অন্যান্য সব ভোগ্যপণ্য যেমন চিনি, তেল, মশলা, পেঁয়াজসহ বেশিরভাগ পণ্যের জন্য আমরা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে মাংস উৎপাদন এবং দুধ উৎপাদনেও স্বল্পতা রয়েছে, ফলে সেটাও আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
ড. শামসুল আলম বলেন, শিল্প বিকাশের জন্য শিল্পায়নের জিনিসপত্রের ওপর ভর্তুকি রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশ বর্তমানে শিল্পোন্নত দেশ। আমাদের জিডিপির প্রায় ৩৫ শতাংশ আসে শিল্পায়ন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ভারী শিল্প থেকে। জিডিপির ১১ দশমিক ৫ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই আয়ের অবদানের ক্ষেত্রে ব্যয়ের ভূমিকা প্রতি বছর বেড়ে যাচ্ছে।
‘যাই হোক, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা ধান উৎপাদনে আশঙ্কার তুলনায় স্বাচ্ছন্দ্যে আছি। তবুও প্রতি হেক্টরে ভিয়েতনামে পাঁচ টনের বেশি ধান উৎপাদন হচ্ছে, যেখানে আমাদের হেক্টরপ্রতি চার দশমিক পাঁচ টন। তাই এখনো আমরা ভিয়েতনামের চেয়ে উৎপাদনে পিছিয়ে আছি। আবার আমাদের জাতগুলোও অনেক আগের এবং দেশীয়, যার আকার এবং উৎপাদন খুবই কম। অন্যদিকে আমাদের আমদানি করা পেঁয়াজ, রসুনের আকার বড়। আমরা ভ্যারাইটিগুলোর উন্নয়নের দিকে বেশ পিছিয়েই আছি। আমাদের জিনগত দিক দিয়ে উন্নতি করতে হবে, জাত উন্নত করতে হবে। এছাড়াও নিরাপদ খাদ্য এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে চিন্তা করা হয় না। ক্ষুধা ও অপুষ্টির সমস্যা মেটাতে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার দিকে নজর দিতে পারি না।’ যোগ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, খাদ্য উৎপাদনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দুর্যোগপ্রবণে আমরা বিশ্বে সপ্তম স্থানে। দেশে খরা, ঠান্ডা, উচ্চ তাপমাত্রার এবং বন্যা লেগেই থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ হার এবং জিনগত ক্ষয় বাড়ছে। ডেল্টা প্ল্যানে বলা হয়েছে, আমাদের ছয়টি হটস্পট রয়েছে। তাই আমাদের হটস্পট ভিত্তিক জাত উৎপাদন করতে হবে।
প্ল্যান্ট ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্স সোসাইটি অব বাংলাদেশ (পিবিজিএসবি)-এর সভাপতি ড. মো. আজিজ জিলানী চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচার রিসার্চ কাউন্সিল (বার্ক)-এর চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার। কি-নোট পেপার প্রেজেন্টেশন করেন শেকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (ফাও)-এর বাংলাদেশের সহকারী প্রতিনিধি ড. নুর এ খন্দকার।
আরও পড়ুন>>চরম গরম মসলার বাজার
শেকৃবি উপাচার্য বলেন, আমাদের কৃষি জলবায়ুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে নানা রকম রোগজীবাণুর আক্রমণ যেমন বৃদ্ধি পেতে পারে, তেমনি খরা, শৈত্যপ্রবাহ, লবণাক্ততার মাধ্যমে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্ষতি লাঘব করার জন্য বিজ্ঞানীরা এখন ফসলের পীড়নসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে নানা রকম মলিক্যুলার প্ল্যান্ট ব্রিডিং কৌশল আবিষ্কার করে চলেছেন। এই কৌশল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জিন সম্পদ।
তিনি বলেন, দেশে জাতীয় উদ্ভিদ জিন সম্পদ ইনস্টিটিউট গড়ে না ওঠায় একদিকে আমাদের জিন সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবহার যেমন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে জিন সম্পদ বিনিময় কষ্টকর ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সেজন্য দেশে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি এর জন্য প্রয়োজন গবেষণার জন্য উপযোগী ল্যাব, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জিন সম্পদ। কেবল প্রচলিত পদ্ধতিতে ফসলের জাত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবর্তনশীল আবহাওয়া উপযোগী জাত উদ্ভাবন সম্ভব নয়। ফসলের মলিক্যুলার বায়োলজিতে পৃথিবীব্যাপী পরিচালিত গবেষণার জ্ঞান ধারণ করে কর্মকৌশল রপ্ত করা এবং দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পারস্পরিক গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি করাও একান্ত জরুরি।
আরও পড়ুন>>রমজান না আসতেই খেজুরের দামেও উত্তাপ
অনুষ্ঠানে উদ্ভিদ প্রজনন এবং কৌলিতত্ত্বে অসামান্য অবদানের জন্য স্বীকৃত প্রজননবিদ ও প্রতিনিধিদের মাঝে ক্রেস্ট ও সনদ বিতরণ করেন প্রধান অতিথি। বাংলাদেশ উদ্ভিদ প্রজনন ও জীবপ্রযুক্তি শিক্ষা ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য শেকৃবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শাহ-ই-আলমকে উদ্ভিদ প্রজনন অ্যাওয়ার্ডস-২০১৯ প্রদান করা হয় এবং উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক (গবেষণা) প্রয়াত ড. তমাল লতা আদিত্যকে উদ্ভিদ প্রজনন অ্যাওয়ার্ড-২০২০ প্রদান করা হয়।
কেনাফ ও মেস্তার উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আল-মামুনকে ইয়ং সাইন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৯ প্রদান করা হয়। উদ্ভিদের কৌলিসম্পদ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ জেনেটিক রিসোর্সেস সেন্টারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রেজওয়ান মোল্লাকে ইয়ং সাইন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০২০ প্রদান করা হয়।
দুই দিনব্যাপী আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ মিলনমেলায় ৫টি টেকনিক্যাল সেশনে দেশি-বিদেশি প্রজননবিদরা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৩৩টি লাগসই গবেষণালব্ধ ফলাফল উপস্থাপন করবেন। এছাড়া বাছাইকৃত ৬০টি গবেষণালব্ধ ফলাফল পোস্টারের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে উপস্থাপন করা হবে।
তাসনিম আহমেদ তানিম/ইএ/জেআইএম
সর্বশেষ - ক্যাম্পাস
- ১ খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ দিনের শোক কর্মসূচি
- ২ শেকৃবিতে সিন্ডিকেট মিটিংয়ে বাধা, সতর্ক করলো প্রশাসন
- ৩ খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে জবি থেকে যাবে ৬ বাস
- ৪ খালেদা জিয়ার মৃত্যু নিয়ে ডাকসু নেতার বিতর্কিত পোস্ট, দুঃখ প্রকাশ
- ৫ জবি শিক্ষককে হেনস্তা: জড়িতদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কার দাবি