টিকে থাকতে জামায়াতের গোপন সমঝোতা!
বগুড়ার কাহালু উপজেলায় বরাবরই জামায়াতের ছিল একছত্র আধিপত্য। জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর হলেন কাহালু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা তায়েব আলী। স্বাভাবিকভাবেই এই উপজেলায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে। তবে এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে গোপন সমঝোতা করতে হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে।
পুলিশি রেকর্ড থেকে জানা গেছে, গত বছরের (২০১৫) জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের (২০১৬) এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে শুধু কাহালু উপজেলায় জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে ২০৭ জন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই জামায়াতের জেলা পর্যায়ের নেতা।
দলের একাধিক সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন পুলিশি অভিযান ও গ্রেফতার আতঙ্কে দিশেহারা জামায়াত শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করার পথ বেছে নেয়। সুফল পায় তারা। এখন এ মাসে ২৫ দিনে মাত্র ২ জন গ্রেফতার হয়েছে। জামায়াত বিরোধী পুলিশি অভিযান নেই বললেই চলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার কাহালুর ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় দূর্গাপুরে নির্বাচন হচ্ছে না। এছাড়া বাকি ৮টি মধ্যে সবকটিতে জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও সমঝোতার ফল স্বরূপ ৩টি ইউনিয়নে তারা আওয়ামী লীগকে ছাড় দিয়েছে। এগুলো হলো- পাইকড়, মুরইল ও কালাই ইউনিয়ন।
জামায়াতের তথ্য অনুসারে, মুরইল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে (ইউপি) গতবার চেয়ারম্যান পদে চার হাজার ৩০০ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ইউনিয়ন কমিটির আমির মোহাম্মদ আবদুল জলিল। এবারের নির্বাচনেও চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন তিনি। কিন্তু সমঝোতায় শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
বাকি ৫টি মধ্যে ৩টি ইউনিয়নে জামায়াতকে ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ এমন শোনা যাচ্ছে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেই। কারণ এই ৩টি ইউনিয়নে রয়েছে জামায়াতের একছত্র আধিপত্য। যার কারণে জামায়াতের সিরিয়াস প্রার্থী হিসেবে বীরকেদার ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন, নারহট্ট ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা শহিদুল্লাহ ও সদর ইউনিয়নে উপজেলা জামায়াতের আমীর ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মোমিন মাঠে রয়েছেন।
এই ৩টি ইউনিয়নে গোপনে সমঝোতার কথাও শোনা যাচ্ছে ভোটের মাঠে। এছাড়া বাকি যে ২টি ইউনিয়ন রয়েছে তার মধ্যে মালঞ্চায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের আব্দুল গনি ও জামগ্রামে বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কালাম থাকলেও তারা পিঠ বাঁচাতে অনেকটাই গা-ছাড়া ভাব নিয়ে চলছেন।
এই উপজেলার বিএনপির প্রার্থীরা অভিযোগ করে বলেছেন, বিপরীতমুখী রাজনৈতিক আদর্শের দল হলেও কাহালুতে জামায়াতের সঙ্গে অন্য রকম সখ্যতা এখন আওয়ামী লীগের। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে এই সখ্যতার কারণেই উপজেলা চেয়ারম্যানসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের নাশকতার মামলায় আসামি করা হয়নি। আর এখন তো কেউ গ্রেফতারই হচ্ছে না। যতো হামলা মামলার শিকার হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
জেলা পুলিশের মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান দাবি করে বলেছেন, এই মাসে জামায়াতের ৭ জনকে তারা গ্রেফতার করেছে। যদিও তাদের নাম ও পদ তিনি জানাতে পারেনি। একই ধরনের দাবি করে, কাহালু থানার ওসি নুরে আল সিদ্দিকী বলেছেন তারা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।
কাহালু উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কাজী আবদুর রশিদ বলেন, এই উপজেলায় বিএনপির মতোই জামায়াতের অবস্থান আগে থেকেই ভালো। দলীয় সিদ্ধান্ত ছিল জামায়াত সবগুলো ইউনিয়নেই প্রার্থী দিবে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা গোপন আঁতাত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী হওয়ার সুযোগ করে দিতে মুরইল ও কালাই ইউপিতে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছে জামায়াত।
আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রতি উদারতা দেখাতেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার কথা স্বীকার করে মুরইল ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আবদুল জলিল বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তেই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলাম। দলের সিদ্ধান্তেই তা প্রত্যাহার করে নিয়েছি। আর বড় কথা এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারেজ উদ্দিন আমার নিকটাত্মীয়। এ কারণে নিজে প্রত্যাহার করে এখন তার জন্য মাঠে আছি।
কাহালু উপজেলা জামায়াতের আমির আবদুস সাহিদ বলেন, মুরইল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রতি উদারতা দেখিয়ে জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন এটা সত্যি। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত হয়নি। এখন দলের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড নেই। পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে সাংগঠনিকভাবে এবার ইউপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিপক্ষে ছিল জামায়াত।
সদর ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা যুবলীগ সভাপতি পিএম বেলাল বলেন, নির্বাচিত চেয়ারম্যান হয়েও শুধু যুবলীগ করার অপরাধে নৌকা প্রতীক পাইনি। মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে দুবর্ল প্রার্থীর হাতে নৌকা তুলে দেয়া হয়েছে। আমার বিজয় ঠেকাতে আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা কুট কৌশলে আঁতাত করেছে জামায়াতের সঙ্গে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি অংশ আঁতাত করার অভিযোগ এনে বিদ্রোহ শুরু হয় দলের মধ্যেই। কালাই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়নের জন্য উপজেলা ও জেলা কমিটি সুপারিশ করেছিল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি রুবেল হোসেনকে। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি মনোনয়ন দিয়েছে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম খন্দকারকে। এখন এখানে রুবেল হোসেন ছাড়াও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবু তাহের সরদার।
পাইকড় ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইউনিয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিটু চৌধুরী। কিন্তু এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন যুবলীগের সদস্য নাছির উদ্দিন। মুরইল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হারেজ উদ্দিন। এখানে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বগুড়া শহর যুবলীগের প্রচার সম্পাদক মকিবুল ইসলাম।
অভিযোগ প্রসঙ্গে কাহালু উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়নি। তারা নিজেরাই অনেক শক্তিশালী। আর বিদ্রোহীরা নৌকার প্রার্থীদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। পাঁচ বিদ্রোহীর মধ্যে চারজনই যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। দল তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
লিমন বাসার/এসএস/এমএস
আরও পড়ুন
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ ঠাকুরগাঁওয়ে জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ারের বিলবোর্ড ভাঙচুরের অভিযোগ
- ২ নির্বাচন ঘিরে উপকূলীয় এলাকায় কোস্ট গার্ডের কঠোর নিরাপত্তা
- ৩ নুরের হয়ে কাজ করায় ছাত্রদল নেতাকে হুমকির অভিযোগ মামুনের বিরুদ্ধে
- ৪ বিএনপি প্রার্থীর নামে ‘ভোটার সম্মানীর রসিদ’ নিয়ে আলোচনার ঝড়
- ৫ খাগড়াছড়িতে চাকমা সম্প্রদায়ের সহস্রাধিক মানুষের বিএনপিতে যোগদান