ভিডিও EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

রাজু সরদারের পুকুর যেন এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

জেলা প্রতিনিধি | নওগাঁ | প্রকাশিত: ১১:৫৬ এএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬

সকালের রোদে ঝিলমিল করছে একটি মাঝারি আকারের পুকুর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে আর দশটা মাছের পুকুরের মতোই। কিন্তু কাছে গেলেই ধরা পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। জেলেদের জালের ফাঁকে ভেসে উঠছে বড় আকারের গলদা চিংড়ি। যা প্রথমবারের মতো চাষ হচ্ছে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয়। এই ব্যতিক্রমী সাফল্যের নায়ক জেলার সদর উপজেলার শৈলগাছী ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের মাছচাষি রাজু সরদার।

রাজু সরদার দীর্ঘদিন ধরেই কার্প জাতীয় মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত। তবে প্রচলিত চাষে লাভ সীমিত হওয়ায় নতুন কিছু করার চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। ঠিক সেইসময় গত জুন মাসে স্থানীয় এনজিও ‘মৌসুমী’র কৃষি ইউনিটের মৎস্য খাতের আওতায় ‘উত্তম ব্যবস্থাপনায় গলদা চিংড়ি চাষ’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীর সুযোগ আসে তার হাতে। প্রদর্শনীর আওতায় তাকে ৫০০ পিস গলদা চিংড়ির জুভেনাইল (পোনা) সরবরাহ করা হয়। অনেকের কাছে বিষয়টি তখনও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও রাজু সরদার থেমে থাকেননি। নিজের উদ্যোগে আরও ১ হাজার পিস জুভেনাইল (পোনা) সংগ্রহ করে কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে সমন্বিতভাবে গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেন। পুকুরে নিয়মিত পানির গুণগত মান পরীক্ষা, সুষম খাদ্য সরবরাহ, তলদেশ পরিষ্কার রাখা সবকিছুই চলে পরিকল্পিতভাবে।

মাছচাষি রাজু সরদার বলেন, গলদা চিংড়ি খুবই সংবেদনশীল। পানির মান ঠিক না থাকলে সমস্যা হয়। তাই নিয়মিত নজরদারি করেছি। এই যত্নের ফল মিলতেও বেশি সময় লাগেনি। অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই গলদা চিংড়িগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে প্রতি কেজিতে ৭ থেকে ৮টি গলদা চিংড়ি পাওয়া যাচ্ছে। যা স্বাদু পানিতে চাষের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সন্তোষজনক ফলাফল।

এ মাছ চাষে সাফল্যের আশা জানিয়ে রাজু সরদার বলেন, এখান থেকে প্রায় ১৩০ কেজি গলদা চিংড়ি উৎপাদন হবে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি গলদা চিংড়ির দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দাম পাবো বলে আমি আশাবাদী। কার্প মাছের পাশাপাশি গলদা চিংড়ি চাষ করায় একই পুকুর থেকে দ্বিগুণ লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রাজু সরদারের পুকুর যেন এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

স্থানীয় মাছচাষি চপল ও সাইফুল বলেন, আগে স্বাদু পানিতে গলদা চিংড়ি চাষ নিয়ে ভয় ও সংশয় ছিল। আমরা আগে ভাবতেই পারিনি গলদা চিংড়ি এভাবে পুকুরে সফলভাবে চাষ করা সম্ভব। রাজু সরদারের সাফল্য দেখে আমরাও এরই মধ্যে গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছি।

রাজু সরদারের পুকুর এখন যেন জীবন্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। প্রতিদিনই আশপাশের এলাকা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষিরা এসে ঘুরে দেখছেন। এরই মধ্যে নওগাঁ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৪০ জন চাষি গলদা চিংড়ি চাষে আগ্রহী হয়ে মাঠে নেমেছেন।

উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমী’র কৃষি ইউনিটের মৎস্য কর্মকর্তা শাহারিয়ার হোসেন বলেন, রাজু সরদারের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, এটি একটি সম্ভাবনার গল্প। নওগাঁয় কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষ ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বাড়বে মাছ উৎপাদন, শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি। একটি পুকুর থেকেই জন্ম নেবে নতুন স্বপ্ন, যা স্থানীয় মৎস্য খাতে যোগ করবে এক নতুন অধ্যায়। পিকেএসএফের সহায়তায় রাজু সরদারের সাফল্য দেখে এরই মধ্যে অনেকেই গলদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

নওগাঁ সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. বায়োজিদ আলম বলেন, এ উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। কার্প জাতীয় মাছের সঙ্গে গলদা চিংড়ি চাষ করলে অল্প জায়গাতেও ভালো আয় করা সম্ভব। রাজু সরদারের এই সাফল্য অন্য চাষিদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমরা চাই স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা মৌসুমীর এ ধরনের উদ্যোগ আরও গ্রহণ করবে।

আরমান হোসেন রুমন/এফএ/এএসএম