রাঙ্গামাটি
গ্যাস সংকটে বন্ধ ফিলিং স্টেশন, গণপরিবহনে ভোগান্তি
তীব্র সংকটের কারণে রাঙ্গামাটির চারটি এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে/ছবি-জাগো নিউজ
পাহাড়ি শহর রাঙ্গামাটিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ভয়াবহ সংকট চলছে। রাঙ্গামাটির সবকটি গ্যাস ফিলিং স্টেশন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি চালিত যানবাহনের মালিক ও চালকরা। রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ গৃহিণীরাও।
জেলার এলপিজি অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা যায়, তীব্র সংকটের কারণে জেলার চারটি এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে হাজারেরও বেশি এলপিজিচালিত যানবাহনের ওপর। গাড়ির মালিক ও চালকরা জ্বালানি না পেয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরেও গ্যাস পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে পেট্রোল ও অকটেন ব্যবহারে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণ। যার প্রভাবে হঠাৎ অতিরিক্ত ভাড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। হঠাৎ খরচ বাড়লেও গ্রাহকরা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে চাইছেন না। এতে করে জেলার এলপিজিচালিত পরিবহন খাত স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির পরিবহন মালিক ও চালকরা।
এলপিজিচালিত অটোরিকশাচালক নাসির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) থেকে কোথাও এলপি গ্যাস পাচ্ছি না। বিকল্প হিসেবে পেট্রোল বা অকটেন দিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। এতে করে জ্বালানি খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আমরা বিপাকে পড়বো।’

শহরের রাজবাড়ি এলাকার অটোরিকশাচালক সাগর ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি ভাড়ায় অটোরিকশা চালাই। জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের কাছে অতিরিক্ত ভাড়া চাইতে হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ বাড়তি ভাড়া কেউ দিতে চাইছেন না। গ্যাসের পরিবর্তে অকটেনে চালাতে গিয়ে খরচ বেড়ে গেছে।’
রাঙ্গামাটির তবলছড়ি এলাকার বাসিন্দা শুভ্র দাশ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আজ একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করতে গিয়েছিলাম। তবে দুই হাজার টাকার ভাড়া তারা সাড়ে তিন হাজার টাকা চাইছেন। হঠাৎ এভাবে ভাড়া বেড়ে গেলে আমাদের জন্য সমস্যা হওয়া স্বাভাবিক। দ্রুত এর সমাধান চাই।’
আরও পড়ুন:
এলসি জটিলতায় এলপিজি সংকট, ‘ঘি ঢালছেন’ ডিলার-খুচরা বিক্রেতা
দ্বিগুণ দামেও মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক অরুপ মুৎসুদ্দি বলেন, ‘ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নেই অজুহাতে রাঙ্গামাটিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল প্রায় বন্ধ। এতে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অটোরিকশায় ভাড়া দুই-তিনগুণ বেড়ে গেছে।’

এদিকে গ্যাস স্টেশনগুলোতে কবে নাগাদ গ্যাস পাওয়া যাবে তার কোনো উত্তর দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। রাঙ্গামাটির জ্বালানি গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মা এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সঞ্জয় দাশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত দুদিন ধরে পাম্পে জ্বালানি গ্যাস নেই। গতকালও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। আজকেও বন্ধ আছে। আজকেই যে গ্যাস পাওয়া যাবে, আমরা এমন কোনো তথ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের দিইনি। কিন্তু সকাল থেকেই অটোরিকশাচালকরা গ্যাসের জন্য লাইন দিয়ে আছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্যাসের গাড়ি রিফিল হচ্ছে। চালান পাওয়া গেলে গাড়ি আসবে। গাড়ি এলেই আমরা সরবরাহ শুরু করবো।’
সঞ্জয় দাশ আরও বলেন, ‘আপাতত যেহেতু গ্যাসের চাহিদা বেশি, সে কারণে আমরা একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে গ্যাস সরবরাহ করবো। কারণ অনেকের এক হাজার টাকার গ্যাস কেনার চাহিদা থাকলেও এ পরিমাণে দিলে সবাইকে দেওয়া সম্ভব হবে না। সে কারণে মালিক এসে সিদ্ধান্ত নেবেন কতটুকু গ্যাস সরবরাহ দেবেন।’
এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে রাঙ্গামাটি শহরের একমাত্র গণপরিবহন অটোরিকশায় বাড়তি ভাড়া নেওয়ার খবরে মাইকিং করে যাত্রীদের সতর্ক করেছে রাঙ্গামাটি অটোরিকশা মালিক ও চালক সমিতি কর্তৃপক্ষ।

রাঙ্গামাটি অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস সংকট চলছে। এ সুযোগে সিএনজিচালকরা কেউ কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাইকিং করে যাত্রীদের সতর্ক করেছি। তবে শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে আজই গ্যাস সরবরাহ করার সম্ভাবনা রয়েছে। এটা হলে সংকট কিছুটা কমবে।’
চলমান এই গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও। বেশিরভাগ খুচরা দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু দোকানে পাওয়া গেলেও দাম চাইছে অতিরিক্ত। এতে করে অনেকে বিদ্যুৎচালিত চুলার দিকে ঝুঁকছেন।
শহরের বিজন সরণি এলাকার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সুশীল চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের রেস্তোরাঁর রান্না পুরোটাই গ্যাসনির্ভর। বর্তমানে যে গ্যাস আছে তাতে হয়তো আজকের দিন রান্না করা যাবে। শহরের কোনো দোকানে গ্যাস নেই। গ্যাস না পেলে রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হবে।’
পৌরসভা এলাকার সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার মিন্টু বলেন, ‘বর্তমানে আমার কাছে কোনো গ্যাস সিলিন্ডার নেই। শনিবার ডিলার থেকে মাত্র ১০টি সিলিন্ডার পেয়েছিলাম। যা ১৪৫০ টাকা দরে কিনে ১৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। যদিও অনেক ব্যবসায়ী আরও বেশি দামে বিক্রি করেছেন বলে শুনেছি।’
এ বিষয়ে জানতে রাঙ্গামাটি শহরের একাধিক গ্যাস সিলিন্ডারের ডিলার মেসার্স জসিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
এসআর/জেআইএম