ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ফুলবাড়িয়ায় বসেছে ‘হুমগুটি’ খেলার ২৬৭তম আসর

জেলা প্রতিনিধি | ময়মনসিংহ | প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

জমিদারদের বিরোধে শক্তি পরীক্ষা এখন পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী খেলায়। ‘হুমগুটি’ নামের ব্যতিক্রমী এই খেলা দেশের একমাত্র ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলাতেই হয়। প্রতি বছরের মতো এবারও খেলা শুরু হয়েছে। ২৬৭তম এই খেলায় অগণিত মানুষের ঢল নেমেছে। খেলাকে কেন্দ্র করে উপজেলাজুড়ে বইছে উৎসবের আমেজ।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেল তিনটায় উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটাবন্দে এলাকাভিত্তিক একেকটা দলের শত শত খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণে হুমগুটি খেলা শুরু হয়। সন্ধ্যার পর থেকে স্থানটি পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ২২ কেজি ওজনের এই গুটি যারাই লুকাতে পারবে সেই দলই হবে জয়ী।

স্থানীয়রা জানান, হুমগুটি ছিল জমিদার আমলে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার খেলা। এখন নেই সেই জমিদার আমল কিংবা রাজায় রাজায় জমি দখলের লড়াই। কিন্তু এখনও রয়ে গেছে সেই ঐতিহ্যবাহী খেলা। দুই রাজার জমি পরিমাপ দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষায় ফুলবাড়িয়ায় শুরু হয় হুমগুটি খেলা। যারাই এই গুটি নিজেদের দখলে রাখতে পারবে তারাই বিজয়ী।

ঐতিহ্যবাহী এই খেলাকে ঘিরে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে উৎসবের আমেজ থাকে। এই খেলাকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুর, দেওখোলাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে সবচেয়ে বেশি চলে উৎসবের আমেজ। বছরের এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকেন হাজারও মানুষ। আর এই খেলার সম্পূর্ণ খরচ বহন করে স্থানীয়রা মিলে। খেলাকে কেন্দ্র করে বড়ই আটাবন্দে গ্রামে জমে ওঠে গ্রামীণ মেলা। খাবার দোকান, খেলনা ও জিনিসপত্রের দোকান ছাড়াও রয়েছে শিশুদের খেলার জন্য চরকি।

ফুলবাড়িয়ায় বসেছে ‘হুমগুটি’ খেলার ২৬৭তম আসর

জানা গেছে, ১৭৫৮ সালে মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশিকান্তের সঙ্গে ত্রিশাল উপজেলার বৈলরের হেমচন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশ। পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখণ্ডে দুই নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে প্রতিবাদী আন্দোলন।

জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসা করতে লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে ‘তালুক-পরগনার সীমানায়’ এ গুটি খেলার আয়োজন করা হয়। গুটি খেলার শর্ত ছিল গুটি গুমকারী এলাকাকে ‘তালুক’ এবং পরাজিত অংশের নাম হবে ‘পরগনা’।

জমিদার আমলের সেই গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হয়। এভাবেই তালুক পরগনার সীমান্তের জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারি এই খেলার গোড়াপত্তন। জমিদার ও জমিদারি প্রথা না থাকলেও সেই হুমগুটি খেলাটির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এলাকাবাসী। খেলায় মুক্তাগাছা, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ সদর ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে দল বেঁধে শত শত খেলোয়াড় ও উৎসুক জনতা আসে খেলাটি দেখতে। এ খেলায় একেক এলাকার একেকটি নিশানা থাকে। ওই নিশানা দেখে বোঝা যায় কারা কোন পক্ষের লোক। ‘গুটি’ কোন দিকে যাচ্ছে তা মূলত চিহ্নিত করা হয় নিশানা দেখেই। নিজেদের দখলে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয় খেলায়। এভাবে গুটি ‘গুম’ না হওয়া পর্যন্ত চলে খেলা।

ফুলবাড়িয়ায় বসেছে ‘হুমগুটি’ খেলার ২৬৭তম আসর

লক্ষ্মীপুর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ হাসমত আলী বলেন, দুই থেকে তিনদিন সময় লেগে যায় এই হুমগুটি খেলা শেষ হতে। নজির আছে, বিরতিহীনভাবে সর্বোচ্চ টানা ১০ দিনও লেগেছে এই খেলা শেষ হতে। গত বছর পূর্ব (পুব্বা) কাটাখালী দল বিজয়ী হয়েছে।

আজিজুল হক নামের আরেকজন বলেন, পিতলের তৈরি বলের মতো দেখতে একটি বস্তুর নাম ‘গুটি’। এটি দিয়েই হয় হুমগুটি খেলা। এই খেলায় নেই কোনো নিয়ম কানুন, থাকে না কোনো রেফারি কিংবা বিচারক। খেলোয়াড়েরও কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাও নেই। গুটি টানাটানিই হলো খেলা। টেনে হিঁচড়ে কাড়াকাড়ি করে যে বা যারা এই গুটি গুম করে ফেলতে পারবে তারাই বিজয়ী।

এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এই ব্যতিক্রমী খেলা খেলেন শত শত লোকজন। এবার ২৬৭তম আসরে খেলোয়াড়রা অংশগ্রহণ করেছে। খেলাকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে খেলা শেষ হবে বলে প্রত্যাশা করছি।

কামরুজ্জামান মিন্টু/এফএ/এমএস