১৭ বছরে বগুড়ায় ১৭ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন, মাঠে শুধুই দুর্ভোগ
উন্নয়নের ঘোষণা ছিল জোরালো। প্রকল্পের সংখ্যাও কম নয়। কোথাও সড়ক, কোথাও ড্রেন, কোথাও নদীভাঙন রোধ। গত ১৭ বছরে বগুড়ার উন্নয়নের নামে সরকারি খাতে খরচ হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এত ব্যয়ের পরও নাগরিক জীবনমানের সূচকে বগুড়া আজও পিছিয়ে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী।
সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিশ্লেষণে মিলেছে এসব তথ্য। দেখা যায়- উন্নয়নের বড় অংশই সীমাবদ্ধ ছিল কাগজে, রিপোর্টে আর উদ্বোধনী ফলকে। বাস্তবে এসব কাজের কোনোটাই টেকসই হয়নি।
কোথায় কত টাকা খরচ
তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে বগুড়া জেলা ও নগর এলাকায় উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক, শহরের প্রধান সড়ক, গ্রামীণ সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একই সড়কে বারবার সংস্কার, নিম্নমানের কাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই বিপুল ব্যয়ের সুফল টেকসই হয়নি।

পৌরসভার আওতায় ড্রেনেজ, সড়ক কার্পেটিং, ফুটপাত, স্ট্রিটলাইট ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কাগজে এসব প্রকল্পে শহরের চেহারা বদলানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বর্ষা এলেই বগুড়ার বড় অংশ জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়, অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে প্রতিটি সড়ক। যা এই ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
নদীভাঙন রোধ ও নদীশাসন খাতে ব্যয় হয়েছে আরও বড় অঙ্ক। যমুনা, বাঙালি, করতোয়া ও ইছামতী নদীর তীর সংরক্ষণ, জিওব্যাগ ফেলা, কংক্রিট ব্লক বসানো এবং নদী খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, ভিটেমাটি হারাচ্ছে হাজার হাজার পরিবার।
শিক্ষা অবকাঠামো খাতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল-কলেজ ভবন নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। ভবন বেড়েছে কিন্তু শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের মান এবং শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে জনবল ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না।
পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় পানি শোধনাগার, পাইপলাইন ও নলকূপ স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তবে অনেক এলাকায় পাইপলাইন থাকলেও নিয়মিত পানি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ণ, বাজার উন্নয়ন, খাল খনন, কৃষি অবকাঠামো ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় বাজেট বই ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), পৌরসভার অনুমোদিত প্রকল্প তালিকা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের তথ্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীভাঙন ও নদীশাসন সংক্রান্ত প্রকল্প নথি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের হিসাব, পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অবকাঠামো প্রকল্পের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে মিলেছে এসব তথ্য।
সড়ক আছে, টেকসই চলাচল নেই
বগুড়া শহরের বনানী-মাটিডালি, সাতমাথা চত্বর, স্টেশন রোড, গোহাইল রোড, নামাজগড় চারমাথা রোড এই পাঁচ সড়কই গত এক দশকে একাধিকবার উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় এসেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং পৌরসভার নথি অনুযায়ী কোনো কোনো সড়কে তিন বছরের মধ্যে দুইবার কার্পেটিং ও ওভারলে কাজ দেখানো হয়েছে। প্রকল্প শেষে ঠিকাদারি বিল পরিশোধও হয়েছে নিয়মমাফিক। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই এসব সড়ক ভেঙে পড়ে, সৃষ্টি হয় বড় বড় খানাখন্দ। ফলে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বাড়ে দুর্ঘটনা ও যানজট।
শহরের বাইরেও চিত্রও একই। এলজিইডির আওতায় গ্রামীণ সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে বড় অংকের ব্যয় হলেও বহু সড়ক বর্ষা এলেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের কামালপুর-কুতুবপুর সংযোগ সড়ক। এটি পাকা করার পর কয়েকবার মেরামত হয়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে ডুবে থাকায় পুরো সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। একই ধরনের সমস্যা ধুনট ও শিবগঞ্জ উপজেলার একাধিক গ্রামীণ সড়কেও। যেখানে কোথাও ব্রিজ আছে কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই, আবার কোথাও সড়ক আছে কিন্তু সেতু না থাকায় বর্ষায় যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আব্দুর কাদের বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে কাজ বিক্রি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ বাস্তবে করেন সাব-কন্ট্রাক্টররা, যাদের ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে কাজের মান নিশ্চিত না করেই প্রকল্প সমাপ্ত দেখানো হয়।
ড্রেনেজ উন্নয়নের নামে বগুড়া পৌর এলাকায় উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। নতুন ড্রেন নির্মাণ, পুরোনো ড্রেন সংস্কার সবই হয়েছে কাগজে। বাস্তবে বর্ষা এলেই শহরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। কোথাও পানি নামে দুই দিনে, কোথাও সপ্তাহেও নামে না।
পৌরসভার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক জায়গায় ড্রেন বানানো হয়েছে, কিন্তু আউটলেট নেই। কোথাও আবার দখলের কারণে পানি নামতে পারে না।
শহরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রথম শ্রেণির পৌরসভার কর দিই। কিন্তু সুযোগ সুবিধা পাই তৃতীয় শ্রেণির।
নদীভাঙনে গেছে হাজার কোটি, থামেনি ক্ষয়
উন্নয়ন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত খাত হয়ে উঠেছে নদীভাঙন রোধ প্রকল্প। যমুনা, বাঙালি, করতোয়াসহ অন্যান্য ছোট নদীর তীর সংরক্ষণের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রায় ২৫০০ থেকে ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে জিওব্যাগ ফেলা, কংক্রিট ব্লক বসানো, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও পুনঃখননের মতো কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিবছর বর্ষা এলেই ভাঙন বাড়ে। নতুন নতুন এলাকা গ্রাস হয়। বিশেষ করে সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলার যমুনা-বাঙালি তীরবর্তী অঞ্চলে একেকটি প্রকল্পে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা শুরুর আগেই কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তোলা হয়। আর বর্ষা নামলেই জিওব্যাগ সরে যায়, কংক্রিট ব্লক ভেঙে পড়ে নদীগর্ভে।
এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে প্রকৃত অর্থে নদী শাসন হয়নি, হয়েছে বরাদ্দ শাসন। নদীভাঙনে বগুড়ায় হাজার হাজার পরিবার একাধিকবার ঘর হারিয়েছে। পুনর্বাসন প্রকল্প থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। ফলে অনেক পরিবার বাঁধের ওপর, সড়কের পাশে বা আত্মীয়ের জমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
অবকাঠামো দাঁড়িয়েছে, ভরসা দাঁড়ায়নি
বগুড়া জেলায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খরচ হয়েছে। এই সময়ে জেলায় শতাধিক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ ভবন নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ কোটি টাকা। নতুন ভবন, বহুতল একাডেমিক ব্লক আর নামমাত্র ডিজিটাল সুবিধা যোগ হলেও শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, আবার কোথাও ছাত্রসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি।
শিবগঞ্জ উপজেলার একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কয়েক বছর আগে ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন চারতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল বোর্ড ও ল্যাব দেখিয়ে প্রকল্পটি সফল হিসেবে সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও বিদ্যালয়টিতে আজও গণিত, বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ের স্থায়ী শিক্ষক সংকট রয়েছে। স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে সেখানে বিষয়ভিত্তিক পূর্ণ শিক্ষক নেই, ফলে একাধিক বিষয়ে খণ্ডকালীন বা অতিরিক্ত দায়িত্বে পাঠদান করাতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র। জেলা সদর হাসপাতাল সম্প্রসারণ, শেরপুর, শিবগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, ধুনটসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নতুন ভবন ও ওয়ার্ড নির্মাণে ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু জনবল সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, অচল যন্ত্রপাতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। অনেক উপজেলায় আধুনিক ভবন থাকলেও এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা আইসিইউ সুবিধা কার্যত অকার্যকর। ফলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনও গুরুতর রোগে শহরমুখী, অনেক ক্ষেত্রে ঢাকামুখী হতে বাধ্য হচ্ছেন, যা চিকিৎসা ব্যয় ও দুর্ভোগ দুটোই বাড়াচ্ছে।
স্থানীয় অর্থনীতিবিদ প্রবীণ শিক্ষক আজাহার আলীর মতে, পরিকল্পনাহীন প্রকল্প, রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বল্পমেয়াদি অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন বগুড়ার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে। অবকাঠামো দাঁড়ালেও মানুষের ভরসা ও ভবিষ্যৎ দাঁড়ায়নি এই বাস্তবতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গবেষক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক মতিউর রহমান বলেন, সমস্যাটা কোনো একক প্রকল্পে নয় বরং পুরো পরিকল্পনা কাঠামোয়। বগুড়ার উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল স্পষ্ট। একই জায়গায় বারবার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের মান যাচাই ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে ছিল মারাত্মক ঘাটতি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে জবাবদিহির অনুপস্থিতি।
এল.বি/এফএ/জেআইএম