ধানের শীষে ভোট দিয়ে গ্রামছাড়া, এবারো ভোট দেওয়া হবে না কাজল রেখার
মাত্র ৬৫০ টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে এবারো ভোটার হতে পারেননি কাজল রেখা দম্পতি। তাই অনেক ইচ্ছা সত্ত্বেও এবারের জাতীয় নির্বাচনেও ভোট দিতে পারবেন না এই দম্পতি। কিন্তু ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেওয়ার অপরাধে ঘরবাড়ি ফেলে প্রায় ১৫ বছর যাবৎ গ্রামছাড়া অসহায় এই পরিবারটি।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের জাগলবা গ্রামে রাস্তার পাশে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন কাজল রেখা ও বাবু শেখ দম্পতি। ঘরবাড়ির অবস্থা জসিমউদ্দিনের ‘আসমানি’ গল্পকেও হার মানায়। স্বামীর যা উপার্জন তা দিয়ে কোনো রকমে দুই বেলা দু’মুঠো খাবার জোটে।
১৫-১৬ বছর আগে নিজের গ্রামে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন। তারপর আর ভোট দিতে পারেননি। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোট দিতে পারবেন না। ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের সময় অনেকেই ভোট চাইতে এসে তাদের গল্প শুনে অবাক হয়েছেন। ভোটার করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। কিন্তু ভোটের পর সেই প্রতিশ্রুতি আর নেতারা রাখেননি।
এই দম্পতির আগে বাড়ি ছিল ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপার ছোট মৌকুড়ি গ্রামে। সেখানে নিজের ১৪ শতক জমির ওপর বাড়ি ছিল। হাঁস-মুরগি ঘরসহ সব ছিল। ১৫-১৬ বছর আগে এক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিতে ভোট দেন তারা। কিন্তু সেবার জয়লাভ করেন নৌকা মার্কার প্রার্থী। এরপর হামলা আর অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে নদী পার হয়ে খোকসার মধ্যে চলে আসেন। সেই থেকে আর গ্রামে ফিরতে পারেননি। স্থানীয় কৃষকদের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। একমাত্র মেয়ে বন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে বিপ্লব মহাজনের গাছ কাটার কাজ করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিনের কাছে ভোটার হওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই নেতা কয়েকদিন ঘুরিয়ে জানান, তাদের বাড়ির কর বাবদ ৬৫০ টাকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হবে। কিন্তু যাদের নিয়মিত ভাত জোটে না, তারা ভোটার হতে টাকা দেবে কোথা থেকে। তাই আর ভোটার হওয়ার চেষ্টা করেননি তারা।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে খোকসা-চাঁদট পাকা রাস্তার পাশের বিবর্ণ টিনের খুপড়ি ঘরটি চোখে পড়ে প্রতিবেদকের। স্বামী-সন্তানসহ কাজল রেখা এই টিনের খুপড়ি ঘরে বাস করেন। ঘরটিতে নেই দরজা-জানালা। পাটকাঠি দিয়ে বেড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সেটাও উইপোকায় খেয়ে গেছে। শীত বৃষ্টি উপেক্ষা করে এর মধ্যেই বাস করে পরিবারটি। রান্নার জায়গার পুরোটাই পলিথিন দেওয়া। কাজল রেখা ঘরে ছিলেন না। লোক দেখে এগিয়ে এলেন। জানালেন স্বামী গেছেন কৃষকের পেঁয়াজ কোপানোর কাজে। আর ছেলে গেছে মহাজনের গাছ কাটার কাজ করতে।
দুঃখ-দুর্দশার গল্প বলতে গিয়ে কাজল রেখা জানান, তারা এই গ্রামের বাসিন্দা না। সেবার ধানের শীষে ভোট দেন। কিন্তু বিপক্ষ নৌকা জিতে যায়। এরপর থেকে গ্রামে শুরু হয় ‘মারামারি-কাটাকাটি’। একদিকে বাপের বাড়ি, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির জমি বাড়ি ফেলে তারা রাতের আঁধারে নৌকায় এসে নানা বাড়িতে আশ্রয় নেন। অনেক দিন যাওয়ার পর মামা এই জমি দেন ঘর করে থাকার জন্য। স্বামীর আয়ে তাদের শুধু খাবারই জোটে।
গল্পে গল্পে কাজল রেখা আরও জানান, চেয়ারম্যান-মেম্বারের ভোট এলে তখন লোকজন এসে বলে তাদের ভোটার করে নেবে। কিন্তু ভোটার হওয়া আর হয়ে ওঠে না। ভোটার হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নেতা হেলালের কাছে গিয়েছিলন। কিন্তু তিনিও ভোটার করতে পারেননি। উল্টো ৬৫০ টাকা লাগবে বলে জানিয়ে দেন। টাকা জোগাড় করতে পারেননি, আর তাই এলাকার ভোটারও হতে পারেননি। একবার ভোট দিয়ে গ্রামছাড়া হয়েছেন। আবার ভোট দিয়ে যদি মামা বাড়ির গ্রামও ছাড়তে হয়, এই ভয়ে আছেন।
আওয়ামী লীগ নেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, কাজল রেখা তাদের নিজের লোক। রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের বাড়িঘর ফেলে এখানে চলে এসেছে। ভোটার স্থানান্তর করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারেননি।
বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল মতিন জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে ১৫-১৬ বছর আগে কাজল রেখা স্বামী-সন্তান নিয়ে এই গ্রামে আশ্রয় নেন। অন্যের জমিতে ঘর করে মানবেতর জীবন পার করছেন। ভোটার হতে বিদ্যুৎ বিলের কপি, ট্যাক্সের কাগজ, জমির কাগজ, ফোন নম্বর লাগবে। তাদের কিছুই নেই, কীভাবে ভোটার হবে বা আগের ভোটার স্থানান্তর করবে। এসব কারণেই ভোটার হতে পারেননি তারা।
এফএ/এমএস