জমি স্বল্পতায় ফিকে হচ্ছে ‘ইউনিফাইড বেনাপোল বন্দর’ প্রকল্প
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের ‘ইউনিফাইড বন্দর’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ৩৫০০ কোটি টাকার ‘এক্সেস’ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্প শুরুর আগেই বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে। প্রকল্পের জন্যে প্রয়োজনীয় ১০২ একর জমি অধিগ্রহণ করার কথা থাকলে মাত্র ৫২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা ইতোপূর্বে কয়েকবার জমি অধিগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ স্থলবন্দর বরাবর লিখিত দাবি জানিয়েছেন। তাই বন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে জমি সংকট দূর না হলে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল। এ বন্দর দিয়ে সরকার প্রতি বছরে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে থাকে। পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক মানের ‘ইউনিফাইড বন্দর’ থাকছে আধুনিক অবকাঠামো, দ্রুত সেবা প্রদান ও বাণিজ্য প্রবাহ বাড়ানো।
এ লক্ষ্যে নেওয়া এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই বড় সংকট দেখা দিয়েছে জমি অধিগ্রহণে। সীমিত জায়গা, অপর্যাপ্ত শেড, ইয়ার্ডের কারণে ট্রাকজট এখন নিয়মিত ঘটনার পরিণত হয়েছে। ‘ইউনিফাইড বন্দর’ নির্মাণের জন্য যে ১০২ একর জমি নির্ধারিত ছিল সেখানে আধুনিক ওয়্যারহাউস, কনটেইনার টার্মিনাল, হেভি স্টক ইয়ার্ড, বড় ট্রাক টার্মিনাল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ফায়ার স্টেশনসহ সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু জমি সংকটের কারণে তা থমকে আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বর্তমান অবকাঠামো বহু আগেই অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন আমদানি পণ্যের পরিমাণ বাড়লেও শেড ও ইয়ার্ডের সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে পণ্যজট এখন নিয়মিত ঘটনা। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের অভিযোগ জায়গার অভাবে ভারতীয় সীমান্তে শতশত পণ্যবাহী ট্রাক দিনের পর দিন আটকে থাকতে হয়। খালাসে সময় বেশি লাগছে ও শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের ভোগান্তিও বাড়ছে। এতে শুধু পণ্যজটই বাড়ে না, ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ খরচও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

তাদের মত, পর্যাপ্ত জায়গা ছাড়া আধুনিক বন্দর নির্মাণের মূল লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, ১০২ একর জমি নিয়ে পুরো প্রকল্পের কাঠামো দাঁড়ানোর কথা। অর্ধেক জমি অধিগ্রহণ করে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন অসম্ভব। জমি সংকট দূর না হলে প্রকল্পটি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, বেনাপোল স্থলবন্দরের ১০২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য যে অবকাঠামো উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল সেটা মাত্র ৫২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য জমির মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা চাই বন্দরের অবকাঠামো অধিক উন্নয়ন ও রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য ১০২ একর জমি যেন অধিগ্রহণ করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই দেখছি ট্রাকের লাইন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত চলে যায়। জায়গার অভাবে চালান খালাসে সময় লাগছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, ৫২ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বেনাপোল বন্দরের অনেক উন্নয়ন হবে। বন্দরের পুরাতন শেডের পরিবর্তে নতুন শেড তৈরি হবে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের অধিকাংশ আমদানিকৃত মালামাল বৃষ্টির সময়ে বন্দরের মধ্যে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যায়। জায়গার অভাবে মালামাল শেডের মধ্যে রাখা যায় না, ট্রাকের ওপর দিনের পর দিন রেখে দিতে হয়। এতে বাড়তি ডেমারেজ গুনতে হয় আমদানিকারককে। এ থেকে মুক্তি পেতে ৫২ একরের পাশাপাশি আরও ৫০ একর জমি অধিগ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা মফিজুর রহমান স্বজন বলেন, ৩৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হলে প্রথম শর্ত হচ্ছে পর্যাপ্ত জমি। জায়গা সংকটে শ্রমিকদের কাজের চাপ বেড়ে গেছে। শেড কম হওয়ায় পণ্যজট তৈরি হলে রাতদিন বন্দর এলাকায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তার ওপর ১০২ একর জমির মধ্যে যদি মাত্র ৫২ একর অধিগ্রহণ করা হয় তবে এই প্রকল্প কখনোই পূর্ণতা পাবে না।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) মো. শামীম হোসেন বলেন, বুড়িমারি, ভোমরা ও বেনাপোল এই তিন স্থলবন্দরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ‘এক্সেস’ প্রকল্প শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বাধিক উন্নয়ন হবে বেনাপোলে। এ জন্য এরই মধ্যে ৫২ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের যে দাবি রয়েছে ১০২ একর জমির বিষয়ে, এটি আমরা সরকারকে জানিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৫২ একর জমি অধিগ্রহণের। পরবর্তীতে যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় সে হিসেবে আমরা তা বাস্তবায়ন করবো। এটি সরকারের উপর নির্ভর করে। বেনাপোল স্থলবন্দরে নতুন প্রকল্পের আওতায় ট্রান্সশিপশেন্ট ইয়ার্ড, বিদ্যুৎ সার্ভিস স্টেশনসহ বিভিন্ন শেড ও ইয়ার্ড তৈরি করা হবে। এতে বন্দরের আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসা বাণিজ্যে ও পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।
মো. জামাল হোসেন/এমএন/এএসএম