আ’লীগ-বিএনপির দুই বেয়াইয়ের পেটে কৃষিজমির মাটি-বালু
‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা (সংশোধন) আইন ২০২৩’ অনুযায়ী উর্বর কৃষিজমি, পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি ও বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে সীমিত আকারে মাটি তোলা যেতে পারে। তবে তা কৃষি বা পরিবেশের ক্ষতি করলে শাস্তিযোগ্য হবে।
দেশের আইনে এমনটা বলা হলেও কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের চর মহেন্দ্রপুর এলাকার চিত্র ভিন্ন। সেখানে প্রায় এক মাসের অধিক সময় ধরে প্রকাশ্যে কৃষিজমির মাটি-বালু কেটে বিক্রি করছে একটি চক্র।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জগন্নাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল্লাহ আল বাকী বাদশা ও ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রশিদ মণ্ডল। তারা সম্পর্কে আপন বেয়াই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের ভাষ্য, চক্রটি অবৈধভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার মাটি ও বালু কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন। প্রায় একমাসের বেশি সময় ধরে এমন মাটি ও বালু কাটার মহোৎসব চললেও ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এতে হুমকিতে পড়েছে চরাঞ্চলের কয়েক হাজার বিঘা কৃষিজমি। ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক।
তবে চেয়ারম্যান অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, প্রভাব খাটিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতারা মাটি ও বালু কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি বিক্রি করছেন। আর মাটি কাটার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আব্দুর রশিদ মণ্ডল।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চর মহেন্দ্রপুর গ্রাম ঘেঁষে পদ্মা নদীর কোল। কোলে পানি জমি আছে। কোলের মাঝখান পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদ এলাকায় বাঁধ নিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। চরে কলা, সরিষা, গম, পেঁয়াজসহ হরেক রকমের সবজি চাষাবাদ করেছেন কৃষকরা। সেখানকার কয়েকটি অংশে ভেকু দিয়ে মাটি ও বালু কাটা হচ্ছে। তা আবার শ্যালো ইঞ্জিনচালিত লাটাহাম্বার, মাহেন্দ্র, ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এতে ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়কগুলো।
এসময় চর এলাকায় কথা হয় জগন্নাথপুর ইউপির চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল বাকী বাদশার সঙ্গে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি চরে তার চাষাবাদ দেখতে গিয়েছিলেন। মাটি ও বালু কাটছেন ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন, বিএনপি নেতা রশিদ মণ্ডলসহ অন্যান্য বিএনপির নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বালু ও মাটিকাটা শ্রমিক বলেন, এগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। প্রায় মাসখানেক ধরে চেয়ারম্যান বাদশা, তার ছেলে মেহেদী হাসান ও বেয়াই রশিদ মণ্ডল বালু ও মাটি কেটে ইটভাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করছেন।
তাদের ভাষ্য, প্রতিদিন কয়েকশো গাড়ি মাটি ও বালু বিভিন্ন দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষকের ভাষ্য, চরে হরেক রকম ফসলের চাষাবাদ হয়। তবুও বাদশা চেয়ারম্যান ও রশিদ মণ্ডল তাদের লোকজন দিয়ে মাটি ও বালু কেটে বিক্রি করছে। এতে অন্যান্য কৃষক ও কৃষিজমি হুমকিতে পড়েছে। ভেঙে যাচ্ছে সড়ক। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাপন। তবে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। তিনি দ্রুত মাটি ও বালু কাটা বন্ধের দাবি জানান। প্রতিবিঘা জমির মাটি-বালু এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে জগন্নাথপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী বলেন, মাটি ও বালু কাটছে চেয়ারম্যান বাদশা, তার ছেলে মেহেদী ও তাদের লোকজন। তিনি শুধু কাটার যন্ত্র ভেকু ভাড়া দিয়েছেন।
এদিকে মাটি কাটার বিষয়টি স্বীকার করে জগন্নাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রশিদ মণ্ডল বলেন, নিজ জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। বিঘাপ্রতি ৬০ -৭০ হাজার টাকা দরে ৩০ বিঘা জমির মাটি কাটার জন্য ঠিক করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, দুই-তিন বছর ধরে মাটি বিক্রি করছেন তিনি। বর্ষার পানি এলে আবারো ভরাট হয়ে যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, চর মহেন্দ্রপুরসহ কোথাও অবৈধভাবে মাটি ও বালু কাটার সুযোগ নেই। এসবের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানে জেল-জরিমানা অব্যাহত রয়েছে। দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আল-মামুন সাগর/এফএ/এমএস