বেনাপোল দিয়ে এক বছরে ভারতে যাতায়াত কমেছে ৬৭ শতাংশ
এক বছরে যশোরের বেনাপোল বন্দরে ভারত ভ্রমণে পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত কমেছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৪ জন। হিসেব অনুযায়ী যা পূর্বের তুলনায় ৬৭ শতাংশ কম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে ভ্রমণ খাতে ভারত সরকারের নিষেধাজ্ঞা, একের পর এক শর্ত আরোপ ও ভ্রমণ কর বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাবে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে চিকিৎসা, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাংলাদেশিরা।
জানা যায়, গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) ও শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে গেছেন মাত্র দুই হাজার ৯৮৯ জন। আগে দিনে ৫-৭ হাজার জন যাতায়াত করতো।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসা, ব্যবসা ও উচ্চশিক্ষা গ্রহণে প্রতিবছর কেবল বেনাপোল বন্দর দিয়েই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০ থেকে ২২ লাখ পাসপোর্টধারী যাতায়াত করে থাকেন। এতে পাসপোর্টধারীরা যেমন সুবিধা পান, তেমনি ভ্রমণ খাতে বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ও ভারত সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশিদের ভিসা সংক্ষিপ্ত করা ও নানা শর্ত আরোপ করে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয় ভ্রমণ করের পরিমাণ। এতে ভ্রমণ খাতে বড় ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়ে। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ভিসা প্রদান সহজ করেনি দেশটি।
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে মোট ২০ লাখ ১৪ হাজার ১২ জন দেশি-বিদেশি পাসপোর্টধারী যাতায়াত করেছেন। এর মধ্যে ভারতে গেছেন ১০ লাখ ১৮ হাজার ৭৫ জন এবং ভারত থেকে ফিরেছেন ৯ লাখ ৯৫ হাজার ৯৩৭ জন।
অপরদিকে ২০২৫ সালে যাতায়াত করেছে মাত্র ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৯২৮ জন। এর মধ্যে ভারতে গেছেন ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৮ জন এবং ভারত থেকে ফিরেছেন ৩ লাখ ২২ হাজার ২২০ জন।

দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত কমেছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৪ জন। ফলে ভারত সরকারের ভ্রমণ খাতে রাজস্ব কমেছে প্রায় ১২১ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের কমেছে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা।
এদিকে ব্যবসা, স্বজনদের সঙ্গে দেখা ও মেডিকেলে পড়াশোনার জন্য প্রতিবছর কেবল বেনাপোল বন্দর দিয়েই প্রায় আড়াই লাখ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশে আসেন। তবে ভিসা প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো বাধা না থাকায় তাদের যাতায়াত স্বাভাবিক রয়েছে। ভুক্তভোগীরা ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পাসপোর্টধারী আনিছুর রহমান বলেন, কড়াকড়ির কারণে ভিসা পেতে অনেক টাকা ও হয়রানি হচ্ছে। তিনবার আবেদন করার পর মেডিকেল ভিসা পেয়েছি। এরপরও সিরিয়াল কিনতে পাসপোর্ট প্রতি খরচ হয়েছে ৭ হাজার টাকা। ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধ জানান।
বেনাপোল বন্দরে অবস্থিত টাইম ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজমের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক জানান, বর্তমানে ভারত ভ্রমণে বাংলাদেশ সরকারকে এক হাজার ৬১ টাকা ভ্রমণ কর, ভারতীয় দূতাবাসকে ভিসা ফি এক হাজার ৫০০ টাকা, ভিসার জন্য স্লট কিনতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ও ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনের ভ্রমণ কর বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া পাসপোর্ট জমা দিতে ঢাকায় যেতে হয়, এতে দুইবার যাতায়াত খরচ আরও প্রায় ৫ হাজার টাকা হয়। সব মিলিয়ে একজন পাসপোর্টধারীকে ভারত ভ্রমণে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ফলে খুব প্রয়োজন না হলে মানুষ ভ্রমণে আগ্রহী হচ্ছে না।
বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) কাজী রতন জানান, আগের বছরের তুলনায় গত বছর বেনাপোল বন্দরে ভারত ভ্রমণে পাসপোর্টধারী যাত্রী যাতায়াত কমেছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৮৪ জন। স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৫ থেকে ৭ হাজার পাসপোর্টধারী যাতায়াত করলেও সর্বশেষ দুই দিনে (শুক্রবার ও শনিবার) বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে গেছেন মাত্র দুই হাজার ৯৮৯ জন।
তিনি জানান, শুক্রবার ভারতে গেছেন ৪৪৩ জন বাংলাদেশি, ২০৫ জন ভারতীয় ও ২১০ জন বিদেশি। এর মধ্যে ভারত থেকে ফিরেছে ৬০১ জন বাংলাদেশি, ১৫২ জন ভারতীয় ও ২ জন বিদেশি। শনিবার ভারতে গেছেন ৫১৫ জন বাংলাদেশি, ২৬১ জন ভারতীয় ও বিদেশি ১২ জন। ভারত থেকে ফিরেছেন ৬৩৯ জন বাংলাদেশি ও ১৫১ জন ভারতীয় ও এক জন বিদেশি। ভ্রমণ খাতে নিষেধাজ্ঞা ও কঠিন শর্তের কারণে যাত্রী যাতায়াত ক্রমেই কমে আসছে।
মো. জামাল হোসেন/এমএন/এএসএম