ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সংকটে থমকে গেছে বাগেরহাট বিসিকের কর্মযজ্ঞ

জেলা প্রতিনিধি | বাগেরহাট | প্রকাশিত: ১২:৩৭ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

অলস পড়ে আছে ভারী ভারী যন্ত্র। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় ধরেছে মরিচা। বন্ধ তেল উৎপাদন। এ চিত্র বাগেরহাট বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত বিভিন্ন নারিকেলের তেল উৎপাদন কারখানার। ৪০টির বেশি মিলের মধ্যে বর্তমানে দুই চারটি ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকলেও লোকসানে সেগুলোও বন্ধের উপক্রম। কর্মসংস্থান হারিয়ে ভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন হাজারো শ্রমিক।

অথচ দুই দশক আগে এ চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোর হতেই দৃশ্য বদলে যেত বিসিক শিল্পনগরীতে। কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। দম ফেলার ফুরসত পেতেন না শ্রমিকরা।

বিসিক ও মিল মালিক সূত্রে জানা যায়, সেসময় নারিকেল প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে জড়িত ছিল দুই হাজারের বেশি শ্রমিক। প্রতিদিন উৎপাদিত হত ২৫-৩০ মেট্রিক টন তেল। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এই তেল চলে যেত ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, রাজবাড়ী, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তবে ২০০৬ সালের দিকে বাজারে মোড়কজাত তেল বিক্রি শুরু হলে কমতে থাকে এই তেলের চাহিদা। পাশাপাশি নারিকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ও ডাবের চাহিদা বাড়তে থাকায় সংকট শুরু হয় কাঁচামালেরও। একইসঙ্গে সুপেয় পানির অপর্যাপ্ততা, ভাঙাচোরা সড়ক, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সমস্যা এই সংকট তীব্র করে তোলে।

সরেজমিনে ঘুরে হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় কর্মব্যস্ততা দেখা গেলেও বেশিরভাগ ছিল সুনসান নীরবতা। সেখানে কাজ করছে দুই-একজন শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় রয়েছে নারিকেল তেলের মিলগুলো। মিলগুলো বন্ধ থাকায় ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে ভেতরের যন্ত্রপাতি। বেকার হয়ে পড়ছে শ্রমিকেরা। তাছাড়া শিল্পনগরীতে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। শিল্প মালিক ও শ্রমিকেরা ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরী ১৯৯৬ সালে শহরের ভৈরব নদের পাশে প্রায় ১৯.৩০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়। এই শিল্পনগরীতে ১১৯টি প্লট রয়েছে। যার প্রতিটিই বরাদ্দ নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গড়ে তুলেছেন ৫২টি শিল্প কারখানা।

কোকোনাট ওয়েল মিল মালিক চয়ন কুন্ডু বলেন, ৫-৭ বছর যাবত যতটুকু নারিকেলের প্রয়োজন ততটা আমরা পাই না। পর্যাপ্ত নারিকেল না পাওয়ার জন্য মিল কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়ছে। আমাদের এই মিলটা আড়াই থেকে তিন মাস পর খুলছি। এই নারিকেলগুলো ভাঙানোর পর আবার কবে নাগাদ খুলবে তার ঠিক নেই। নারিকেলের অভাবে দিন দিন সব মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেরালা ও শ্রীলঙ্কা থেকে যে নারিকেল আসে তার দামও বেশি থাকে।

কারখানায় কাজ করতে আসা শ্রমিক দেলোয়ার শেখ জানান, আগে মহাজনের তিনটি মেশিনে তেল ভাঙানো লাগতো। এখন কোনোমতে একটিতে কাজ করছি। মেশিনগুলোও মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। আগে এক সময় এই মিলেই ৩০ জন শ্রমিক কাজ করত। এখন নারিকেল পেলে তিন-চার মাস পর পর একটু খোলা হয়। বাকি সময় বন্ধই থাকে। বন্ধ থাকা সময় বাইরের কাজ করি। সব সময় কাজও পাই না। এই মিল বন্ধ থাকায় আমাদের খেয়ে না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।

রানা হাওলাদার নামে আরেক মিল মালিক বলেন, বিগত চার বছর ধরে পানি নেই। খাবার পানি নেই, ব্যবহারযোগ্য পানিও নেই। আমাদের এখানে একটি পুকুর থেকে পানি সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা ছিল। সাপ্লাইয়ের সেই লাইনগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে।

অরণ্য সাহা নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, কিছু কিছু রাস্তার কাজ হলেও এখন বেশ কিছু রাস্তার কাজ বাকি আছে। বর্ষার সময় আমাদের এখানে হাঁটু সমান পানি উঠে যায়। বিসিকে অবকাঠামোর যে উন্নয়ন প্রয়োজন সেটা নেই। খাবার পানি ও ব্যবহারযোগ্য পানির চরম সংকট রয়েছে। ধীরে ধীরে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার এইগুলোকে নজরদারিতে না রাখলে বিসিক শিল্প নগরী হুমকির মুখে পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজনের অভিযোগ রয়েছে, বিসিক শিল্পনগরীর ড্রেন ও রাস্তার কাজ হয়েছে রাতের আঁধারে। ফলে কাজ মানহীন হয়েছে বলে দাবি তাদের।

বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. শরীফ সরদার বলেন, নারিকেলের অপর্যাপ্ততার কারণে তেলের দুটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। অন্যান্য কারখানাগুলোও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া আমাদের শিল্পনগরীতে রাস্তা, ড্রেনসহ অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা ছিল সেগুলো গত বছরগুলোতে কাটিয়ে উঠেছি। এখন রাস্তা ও ড্রেনের যে সমস্যা রয়েছে তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ভেতর সংস্কার করতে পারবো।

তিনি আরও বলেন, সুপেয় পানির যে সংকট রয়েছে সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। এ সমস্যা সমাধানে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সাবমারসিবল পাম্প নির্মাণ করা হবে। শিল্পনগরীতে কোনো বাউন্ডারি ওয়াল নেই। এতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তবে নিরাপত্তার জন্য প্রতিনিয়ত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে। তারা প্রতিদিনই সন্ধ্যার পর এসে টহল দিচ্ছে।

নাহিদ ফরাজী/এফএ/জেআইএম