ফরিদপুর মেডিকেলে দীর্ঘদিন অচল ৮ কোটি টাকার ক্যাথল্যাব
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত কয়েক কোটি টাকার হৃদরোগ বিভাগের অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে স্বল্প খরচে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।
২০১৬ সালে স্থাপন করা এ ক্যাথল্যাবটি আজও অজ্ঞাত কারণে চালু না হওয়ায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যাথল্যাবটি চালু থাকলে এখানে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টিসহ (রিং পরানো) হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কম খরচে দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এ গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে ফরিদপুরে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর ক্যাথল্যাব নেই। ফলে জরুরি অবস্থায় রোগীদের ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি। ক্যাথল্যাব চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যেমন ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান থাকলেও মূল সমস্যা হচ্ছে যন্ত্রপাতি সচল না থাকা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনটি অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন
ডাক্তারের অভাবে চালু হয়নি এনজিওগ্রাম ও হার্টের রিং স্থাপন
কেনা হবে এক্সরে ক্যাথল্যাব মেশিন, জাপান যাচ্ছেন সচিব-ডেস্ক অফিসার
ময়মনসিংহ মেডিকেলে তৃতীয়বারের মতো চালু হলো ক্যাথল্যাব
এদিকে ফরিদপুরে বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সেবা থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পক্ষে সেই সেবা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম (৫৬) বলেন, ‘আমার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে বলেছেন। এখানে ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় যেতে হয়েছে। যাতায়াত, পরীক্ষা আর চিকিৎসা মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টকর।’

আরেক রোগী সাজেদা বেগম (৪২) বলেন, ‘হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে আমার বড় বোনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এখানে উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে। যদি এখানে ক্যাথল্যাব চালু থাকত, তাহলে হয়তো এত ঝামেলা পোহাতে হতো না।’
সালথা উপজেলার বাসিন্দা মো. হান্নু মোল্যা বলেন, ‘রাতে হার্টের সমস্যা হলে ঢাকায় নিতে নিতে অনেক সময় চলে যায়। এ সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ফরিদপুরে ক্যাথল্যাব থাকলে অনেক রোগী বেঁচে যেত।’
নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমার বাবা গত বছর হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। তখন তাকে ফরিদপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে হৃদরোগের চিকিৎসা না পেয়ে ফরিদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে আবার নিয়ে যাই। তার কয়েকদিন পরে মারা যান আমার বাবা। আমার বাবা যদি তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা পেতেন, তাহলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত।’
এ ব্যাপারে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আজমল হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান রয়েছে। কিন্তু ক্যাথল্যাবের মেশিনটি দীর্ঘদিন চালু না থাকায় অকেজো হয়ে গেছে। মেশিনটি ঠিক করা গেলে আমরা খুব দ্রুতই সেবা চালু করতে পারব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. হুমায়ূন কবির বলেন, ‘ক্যাথল্যাবটি দীর্ঘদিন অচল। আমরা এটি সচল করার জন্য নিমিউকে (ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ) চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা জানিয়েছে, মেশিনটি ভালো নেই এবং তারা কাজ করতে পারবে না। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যেখান থেকে মেশিনটি কেনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ফিলিপস কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো সমাধান দেয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ফিলিপস কোম্পানির তৎকালীন প্রতিনিধি মো. রফিক বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে আমরা মেশিন সারাতে চাহিদাপত্র দিয়েছিলাম। পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ করেননি।’
এন কে বি নয়ন/আরএইচ/এএসএম