মেয়াদ বাড়িয়েও অনিশ্চয়তায় ৬৭ কোটির গল্লামারী সেতু প্রকল্প
খুলনা নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ গল্লামারী সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি, বরং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করেই একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এতে সেতু এলাকায় প্রতিদিন তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নগরীর গল্লামারী মোড়ে ময়ূর নদের ওপর দুটি স্টিল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর। প্রকল্প অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ সেতু দুটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় পুনরায় ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে। দুইটি স্টিল সেতু এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য সড়ক বিভাগের সঙ্গে ঠিকাদারের চুক্তি মূল্য ছিল ৬৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। একটি মাত্র সেতুর মাঝে বাঁশ দিয়ে ডিভাইডার তৈরি করে আসা যাওয়া করছেন সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন ছোট বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। সাধারণ মানুষদের ভুগতে হচ্ছে যানজটে। ব্রিজ নির্মাণের কিছু জিনিসপত্র এদিক সেদিক ফেলে রাখা হয়েছে। বড় যানবাহন যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা সড়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, গল্লামারি সেতুর কাজ তদবিরে এনডিই কোম্পানি পেয়েছে। আওয়ামী লীগের সময়ে স্থানীয় একটি মহল ব্রিজের কাজ শুরু করে। মূল কোম্পানি কাজে আসেনি। প্রকল্পের অর্থের একটি বড় অংশ ভাগবাটোয়ারা হয়ে গেছে। ৫ আগস্টের পর এখন কোম্পানি কাজে এসে অর্থ সংকট দেখিয়ে কাজ ফেলে রেখেছে। এমন জটিলতায় কোম্পানিকে শাস্তিমূলক কোনো জবাবদিহিতায় আনতে দিচ্ছে না প্রভাবশালী একটি মহল।
তিনি আরও বলেন, বড় ধরনের এসব প্রকল্প ঘিরে কমিশন ভাগাভাগি হয়েছে। বিল ছাড়াও হয়েছে। বর্তমানে টাকার জোরে আইনকে ব্যবহার করে যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এনডিই কোম্পানিকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি তদন্ত করলে থলের খবর বেরিয়ে আসবে। আমরা কর্মচারী হয়ে এর বেশি আর কী বলবো!
স্থানীয় ব্যবসায়ী কারিমুল হক বলেন, গল্লামারি সেতু নিয়ে প্রায় দশ বছরের ভোগান্তি। আগে একবার সেতু নির্মাণ করে ভেঙে ফেলা হয়। আবার সেতু তৈরির কথা বলে বছর বছর ধরে ফেলে রাখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিন যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে আমাদের। ব্যস্ত শহরে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এরকম কাজ ফেলে রাখা আমাদের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছু না।

ইজিবাইক চালক খোকন মিয়া বলেন, গল্লামারি থেকে বটিয়াঘাটা রুটে ইজিবাইক চালাই। গল্লামারি ব্রিজের এপার আর ওপার এখন ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট থাকে। শহরে ঢুকতে গল্লামারি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশ পথ। সকলের এই পথ ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ব্রিজের কাজ এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছে যে, এখান থেকে যেতে ১ মিনিটের জায়গায় এখন ১০ মিনিট সময় লাগে। হাত-পা বেঁধে ডাস্টবিনে ফেলে রাখলে যেমন হয়, এই সেতুর কাজের অবস্থা এখন তেমন হয়েছে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সভ্য সমাজে অসভ্যের মতো কাজের উদাহরণ হলো গল্লামারি সেতুর নির্মাণকাজ। দীর্ঘদিন কাজ ফেলে রেখে নগরবাসীর সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের অর্থের একটি বড় অংশ আগেই ভাগবাটোয়ারা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে একাধিকবার। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সে অর্থ মেকাপ করতে পারেননি বলে কাজ আটকে আছে।

তিনি আরও বলেন, কাজ না করে গল্লামারীর রাস্তার একটি বড় অংশ ঘেরবেড়া দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। যার কারণে যানজট ও ভোগান্তি আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। অনতিবিলম্বে কাজ সম্পন্ন না করলে মানুষের ভোগান্তি বাড়বে ছাড়া কমবে না।
হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, এই প্রকল্পের সার্বিক বিষয়গুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার ভেতরে আনতে হবে। নইলে নাগরিক সমাজ আন্দোলনে যাবে এবং আন্দোলন ঘিরে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে নিতে হবে।
খুলনা জেলা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সংকট থাকায় এখনই ব্রিজের কাজ সম্পন্ন করতে পারছে না। কিন্তু মে মাসে কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত কাজের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে মেয়াদ পুনরায় বৃদ্ধি করে ২০২৮ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। আমার সময়ে গত দেড় বছরে কাজ না হওয়ায় কোনো বিল ছাড় হয়নি। তবে কাজ দ্রুত শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।
এফএ/জেআইএম