ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

শেফালীর নকশিকাঁথায় স্বাবলম্বী আড়াইশো নারী

জেলা প্রতিনিধি | গাইবান্ধা | প্রকাশিত: ১০:৪৩ এএম, ২২ মার্চ ২০২৬

শেফালী বেগমের (৪৬) বয়স যখন সাত মাস তখন তার বাবা-মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। শেফালী বড় হতে থাকেন সৎ মায়ের সংসারে। সৎ মায়ের আট সন্তানের সংসারে সবচেয়ে অবহেলার পাত্রী ছিলেন তিনিই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিন ছেলে-মেয়ের মা হন শেফালী। পাঁচ সদস্যের সংসার ভালোই চলছিল। ২০০৯ সালে স্বামী অবসরে যান। এতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বিপাকে পড়েন শেফালী। এরপরই শুরু করেন কাঁথা সেলাইয়ের কাজ। বাড়িতে কাঁথা সেলাই করে শহরে বিক্রি করতেন। এতে প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হত। এই টাকা দিয়ে হাল ধরেন সংসারের।

২০১৮ সালে তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) থেকে দুই মাসের সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেন। ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রথমে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। এরপর বড় পরিসরে যাত্রা শুরু হয় তার। বর্তমানে তার অধীনে ২৫০ জন নারী কাজ করছেন। খরচ বাদে তার মাসিক আয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তিনি পাঁচ শতক বসতভিটায় পাকা বাড়ি করেছেন। বেশ কিছু জমিও কিনেছেন। তিনি এখন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা।

প্রকারভেদে একটি নকশীকাঁথা তৈরি করতে শেফালী বেগমের মজুরিসহ খরচ হয় দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটির দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ হাত ও প্রস্থ সাড়ে চার হাত। একটি কাঁথা তৈরি করতে একজন নারীর ১৫ দিন সময় লাগে। নকশা করা প্রতিটি কাঁথা আড়াই হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা ও রংপুরে এসব নকশিকাঁথা বিক্রি হয়।

শেফালীর নকশিকাঁথায় স্বাবলম্বী আড়াইশো নারী

শেফালী বেগমের অধীনে কাজ করে পলাশবাড়ী উপজেলার ২৫০ জন দরিদ্র নারী এখন স্বাবলম্বী। প্রতিজন নারী মাসিক চার থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।

গৃধারীপুর গ্রামের বিউটি খাতুন (২৫) বলেন, আমার স্বামী আল আমিন উপজেলা শহরে চায়ের দোকান চালান। দোকানের আয়ে ছয়জনের সংসার চলে না। ২০০০ সাল থেকে এখানে কাজ করছি। প্রতি মাসে গড়ে ছয় হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

শেফালীর নকশিকাঁথায় স্বাবলম্বী আড়াইশো নারী

একই এলাকার পিংকি রানীর (৪৫) স্বামী বাস শ্রমিক। তার আয় দিয়ে চার সদস্যের সংসার ঠিকঠাকভাবে চলে না। পিংকি বলেন, চার বছর ধরে শেফালী আপার অধীনে কাজ করছি। প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা আয় করছি। এই টাকা দিয়ে সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের জোগান দিচ্ছি।

পার্শ্ববর্তী উদয়সাগর গ্রামের দশম শ্রেণির ছাত্রী মিতু খাতুন জানায়, বাবা-মা ঠিকমতো লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারেন না। তাই পড়াশোনার ফাঁকে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছি। প্রতি মাসে গড়ে চার হাজার টাকা আয় হচ্ছে। তা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। মাঝে মধ্যে সংসারেও দিচ্ছি।

শেফালীর নকশিকাঁথায় স্বাবলম্বী আড়াইশো নারী

এরই মধ্যে ২০২৫ সালে ‘অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী’ ক্যাটাগরিতে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতার পুরস্কার পেয়েছেন শেফালী বেগম।

শেফালী বেগমের বাবার বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌর শহরের ছোট আমবাড়ী এলাকায়। তার বাবা দেলোয়ার হোসেন ২০০০ সালে মারা যান। ১৯৯০ সালে একই উপজেলার শহরের উদয়সাগর মুন্সিপাড়া এলাকার রেজাউল আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় শেফালী বেগমের। বর্তমানে রেজাউল আলম কর্মহীন। বড় মেয়ে আশামনির বিয়ে হয়েছে। বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ রংপুর পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট থেকে ইলেকট্রো মেডিকেল বিভাগ থেকে পাশ করে চাঁদপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। তিনি পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন। ছোট ছেলে তৌফিক নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

শেফালী বেগম বলেন, নারীদের অধিকার নিয়ে শুধু রাস্তায় প্রতিবাদ না করে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিন। একজন নারী সমাজের দর্পনও। বর্তমানে পরিশ্রমী নারীরা সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে অপরিসীম ভূমিকা পালন করছেন।

আনোয়ার আল শামীম/এফএ/জেআইএম