কুমিল্লার অরক্ষিত ১১৬ রেলক্রসিং যেন ‘মরণফাঁদ’, দশ বছরে ৫৫৩ মৃত্যু
ছবি: সাইন বোর্ড ঝুলিয়েই দায়িত্ব সেরেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ছবি/ জাগো নিউজ
রেলওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের ১৮৬ কিলোমিটার অংশের বিভিন্ন স্থানে ১১৬টি অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব স্থানে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। লাকসাম রেলওয়ে থানার আওতাধিন এলাকায় গত দশ বছরে সাড়ে পাঁচ শতাধিক মৃত্যু হয়েছে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছে অসংখ্য মানুষ। এসব রেলক্রসিং পথচারী ও যাত্রীদের জন্য অনেকটা ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। তাছাড়া গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলার কারণেও বৈধ লেভেল ক্রসিংও এখন ‘মরণফাঁদ’।
সর্বশেষ গত ২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে লক্ষ্মীপুর যাওয়ার পথে মামুন স্পেশাল পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নারী ও শিশুসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ১৫ জন।
দুর্ঘটনাপ্রবণ এসব স্থানে ‘অনুমোদনহীন লেভেল ক্রসিং, নিজ দায়িত্বে পারাপার হউন’ এমন সাইন বোর্ড ঝুলিয়েই দায় এড়াচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া যেসব রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান রয়েছে সেখানেও তাদের গাফিলতির কারণেও ঘটছে ছোট-বাড় দুর্ঘটনা।

রেলওয়ে সূত্র মতে, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লার লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথের ৪৯ কিলোমিটার এলাকায় বৈধ ১৯টি ও অবৈধ ৪২টি, লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের ৫১ কিলোমিটারে বৈধ ২৩টি ও অবৈধ ৩৬টি এবং লাকসাম-আখাউড়া রেলপথের ৭২ কিলোমিটারে বৈধ ৩৩টি ও অবৈধ ৩৮টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এসব এলাকায় অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের ৩২টি স্থানে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাস্তা এবং বাকি রাস্তাগুলো পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিধান না মেনে এলজিইডি, সড়ক বিভাগ ও পৌরসভা ইচ্ছামতো রাস্তা নির্মাণ করে মরণফাঁদ তৈরি করছে।
গত দশ বছরে রেলপথের কুমিল্লা অঞ্চলে ট্রেনে কাটা পড়ে, ট্রেনের ধাক্কায় ও যানবাহনে করে অসতর্ক অবস্থায় পারাপারের সময় সংঘর্ষে মোট ৫৫৩ জন নিহত হয়েছে। বেশিরভাগ স্থানেই রেলক্রসিংগুলোতে কোনো গেট ও গেটম্যান নেই। প্রাণহানির অধিকাংশই হয়েছে অবৈধ রেলক্রসিংয়ে।
আরও পড়ুন-
গাজীপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে মা-ছেলের মৃত্যু
কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে নিহত ১২, মিললো দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ
ট্রেনের ছাদের যাত্রীদের জংশনের টিনশেডে মূত্রত্যাগ, নেটিজেনদের সমালোচনা
দিনাজপুরে দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত
লাকসাম রেলওয়ে থানার অধীন রেলপথের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় ২০১৭ সালে ৭৪ জন, ২০১৮ সালে ৬৮, ২০১৯ সালে ৬৬, ২০২০ সালে ৩৭, ২০২১ সালে ৪২ জন, ২০২২ সালে ৪৯, ২০২৩ সালে ৪৫, ২০২৪ সালে ৬৪, ২০২৫ সালে ৭৮ জন এবং চলতি বছরের ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৩০ জন নিহত হয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রেনচালক ও সহকারী চালক জানান, অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের কারণে তারা সব সময় আতঙ্কে থাকেন। যেসব স্থান দিয়ে খুব বেশি যান চলাচল করে সেগুলোর কাছে গিয়ে অনেক সময় হর্ন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় যে বিভিন্ন যানবাহনের চালক ভালো করে না দেখেই এসব ক্রসিং অতিক্রম করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। আবার কখনো কখনো যানবাহন বন্ধ হয়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে।
নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো মৃত্যুর ফাঁদ। সরকার জেনে হোক আর না জেনে হোক এতদিন এগুলোকে খোলা রেখে মানুষের জীবন এবং সম্পদকে ভুলুণ্ঠিত করেছে। অনতিবিলম্বে মানুষের জানমালের স্বার্থে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং রক্ষা করা হোক। একজন নাগরিকের চলাচল নির্বিঘ্ন করা সরকারের দায়িত্ব। রেললাইনে দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছে সরকারের উচিত প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
লাকসাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিম উদ্দন বলেন, লাকসাম রেলওয়ে থানার অধীনে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণপাড়ার সালদা থেকে ফেনীর মুহুরীগঞ্জ পর্যন্ত, লাকসাম-নোয়াখালী রুট এবং লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে লাকসামের চিতোষীর আগ পর্যন্ত রুটে ১৮৬ কিলোমিটারের মধ্যে বেশ কিছু অবৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এসব এলাকায় অসাবধানতার কারণে পথচারী, যাত্রী কাটা পড়ে এবং পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা বেড়েই চলেছে। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতাই মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারে।

অরক্ষিত ক্রসিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, কুমিল্লায় ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষের ঘটনার তদন্ত চলছে। রেলপথে দুর্ঘটনা কমাতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া লেভেল ক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও আমরা কাজ করবো।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু রেজা হাসান বলেন, অরক্ষিত রেলক্রসিংগুলো নিরাপত্তার আওতায় নিয়ে আসার জন্য পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে অনুরোধ জানানো হবে। তারা যেন সরেজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এফএ/এএসএম