ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

মুখ থুবড়ে পড়েছে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প

প্রকাশিত: ০৩:৩৩ পিএম, ২০ জুলাই ২০১৬

হবিগঞ্জের ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১১ সালে প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও ভূমি জটিলতাসহ নানা অজুহাতে পাঁচ বছর ধরে এটি ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। থেমে আছে এর সব কার্যক্রম। ইতোমধ্যেই ন্যাশনাল টি কর্পোরেশনের (এনটিসি) সিদ্ধান্তে ম্যানেজার বাংলোর চারপাশে দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রথম দিকে এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধারা খুব তৎপর থাকলেও এখন তাও কমে গেছে। এর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে হাফিয়ে উঠছেন তারা। তবুও তারা হাল ছাড়েননি। এখনো বিভিন্ন দফতরে দৌড়াচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, বর্তমান সরকারের আমলেই এখানে কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হবে।

সরেজমিন ঘুরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলো থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। জেনারেল এমএজি ওসমানীর নেতৃত্বে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ঊর্ধ্বতন ২৭ জন সেনা কর্মকর্তা ওইদিন এখানে মিলিত হন। এখানে তারা বৈঠক করে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেন।

রণাঙ্গনকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে ১১ জন কমান্ডারকে দায়িত্ব দেয়া হয়। একই বৈঠকে জেনারেল ওসামানী তিনটি ব্রিগেড ফোর্স গঠন করেছিলেন। যাদের নাম দেয়া হয় ফোর্সগুলোর অধিনায়কদের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে।

প্রথম, তৃতীয় ও অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক করা হয় মেজর জিয়াউর রহমানকে। এটির নাম দেয়া হয় ‘জেড’ ফোর্স। চতুর্থ, নবম ও দশম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক করা হয় মেজর খালেদ মোশাররফকে। এর নাম দেয়া হয় ‘কে’ ফোর্স। আর দ্বিতীয় ও একাদশ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক করা হয় মেজর কেএম সফিউল্লাহকে। এর নামকরণ করা হয় ‘এস’ ফোর্স। পরে জেনারেল ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ে এদিন যুদ্ধের সূচনা করেন।

Habigonj

স্বাধীনতার পর সেখানে বুলেট আকৃতির দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে ঐতিহাসিক এ বাগানের ম্যানেজার বাংলোটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

সাধারণ দর্শনার্থীরা মন খুলে এটি দেখতে পারত। কিন্তু সম্প্রতি বাগান কর্তৃপক্ষ দেয়াল নির্মাণ করে ম্যানেজার বাংলো থেকে স্মৃতিসৌধটি পৃথক করে দিয়েছে। এমন ঐতিহাসিক স্থানটি স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও রয়ে গেছে চরম অবহেলিত। এটির রক্ষণাবেক্ষণে লক্ষণীয় তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) কাজী কবির উদ্দিন জানান, এনটিসির অসহযোগিতার কারণে এখানে মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বাগানের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার অজুহাতে তারা এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে না। আমি আশা করি বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকারের আমলেই এটি নির্মাণ করা হবে। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্মুন্নত রাখতে এটি অবশ্যই নির্মাণ করা প্রয়োজন।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী পাঠান জানান, ২০১১ সালের ৭ মে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হেলাল মুর্শেদ খান বীর বিক্রম এখানে কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দেন। তা নির্মাণে ১০ কোটি টাকা আনুমানিক ব্যয়ও ধরা হয়েছিল। এজন্য প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছিল। দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীকে। তিনি সব প্রক্রিয়াও করেছিলেন। কিন্তু এখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করলে বাগানের পরিবেশ নষ্ট হবে এমন দাবির অযুহাতে এনটিসি (ন্যাশনাল টি কর্পোরেশন) তা বাস্তবায়নে আপত্তি তুলে। এর ফলে উক্ত প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

তিনি বলেন, তবে এখনো আমরা আশা ছাড়িনি। আবারো বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই সমস্যা সমাধান করে কমপ্লেক্স নির্মাণ শুরু হবে।

তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক এমদাদুল হক জানান, বাগান এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স তৈরিতে বাগান কর্তৃপক্ষের কোনো আপত্তি নেই। তবে এ জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ম্যানেজার বাংলোর চারপাশে দেয়াল দেয়া হয়েছে এনটিসির (ন্যাশনাল টি কর্পোরেশন) সিদ্ধান্তে। বাংলোর নিরাপত্তার স্বার্থে এটি দেয়া হয়েছে। তবে দর্শনার্থীরা বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাংলোয় প্রবেশ করতে পারেন।

জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ভারত সীমান্ত ঘেঁষে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের অবস্থান। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি অত্যন্ত সুন্দর, নির্জন ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। ম্যানেজার বাংলোর পাশ ঘেঁষেই রয়েছে একটি লেক। যা এর সৌন্দর্য্যকে আরো প্রস্ফুটিত করে তুলেছে। তেলিয়াপাড়া চা বাগানে যাতায়াতের দুইটি রাস্তা রয়েছে। এর একটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর হয়ে পূর্ব দিকে এবং অপরটি একই মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ গোলাচত্বর হয়ে দক্ষিণে চুনারুঘাট উপজেলা সদর হয়ে।

সড়কটি মূলত ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়ক হিসেবেই পরিচিত। সড়কের পাশেই তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধের ফলক দিয়ে রাস্তা দেখানো হয়েছে। চা বাগানের ভেতর দিয়েই এখানে যেতে হয়।

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এআরএ/এবিএস