৬৮ বছর পর ভোটার হচ্ছেন শতবর্ষী রোস্তম-মনিন্দ্রনাথ
জীবনের পড়ন্ত বেলায় ভোটারের খাতায় নাম লেখাতে পেরে খুশি অধুনালুপ্ত ছিটমহলবাসী রোস্তম আলী ও মনিন্দ্রনাথ রায়। রোস্তম আলীর বয়স প্রায় ৯০ বছর। এ বয়সে এসে ভোটার হচ্ছেন তিনি। ভাবতে নাকি খুব ভালো লাগছে তার। তার কথায় ‘জীবনে আর বাচমু কয়দিন বা, এ্যাহন ভোটার হচ্ছি। ভোট দিমু মনে হতে ভালাই লাগছে।’
অধুনালুপ্ত ছিটমহল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়ার হাবিবপুর গ্রামের অধিবাসী রোস্তম আলী।
একই গ্রামের শতবর্ষী সুকিতন বেওয়াও এবার ভোটার হচ্ছেন। জোরে কথা বলার শক্তি না থাকলেও ইঙ্গিতে জানান, তার আনন্দের বিষয়টা। মনিন্দ্রনাথ রায় ৭০ বছর বয়সী। চার ছেলে ও তিন মেয়েসহ এবার ভোটার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় গত ১০ জুলাই। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারের তথ্য সংগ্রহের এ কাজ শেষ হয় ১৬ জুলাই।
এরপর ১৭ থেকে ২৫ জুলাই নির্দিষ্ট স্থানে ভোটারদের ছবি তোলা শুরু হয়েছে এবং বায়োমেট্রিক করা হবে।
এরই মধ্যে খসড়া ভোটার তালিকার সিডি প্রস্তুত, খসড়া ভোটার তালিকা মুদ্রণ প্রকাশ ও খসড়া ভোটার তালিকার ওপর আপত্তি ও নিষ্পত্তিকরণ, ভোটার তালিকা সংশোধন শেষে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা আগামী ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর ১০টি ও ফুলবাড়ীর একটি বৃহৎ বিলুপ্ত ছিটমহলের তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন ১৯ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং চারজন সুপারভাইজার। এর মধ্যে দাসিয়ারছড়ায় ১৪ জন তথ্য সংগ্রহকারী, তিনজন সুপারভাইজার ও ভুরুঙ্গামারীর ১০টি ছিটমহলে পাঁচজন তথ্য সংগ্রহকারী ও একজন সুপারভাইজার ভোটার হালনাগাদের কাজ করছেন।
গত ১১ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন দাসিয়ারছড়ার অধিবাসীদের নামের তালিকার গেজেট প্রকাশ করে। ছিটমহল বিনিময়ের পর ভোটার এলাকা পুনর্বিন্যাস করে ফুলবাড়ী সদর, কাশিপুর ও ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করে বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া অধিবাসীদের নাগরিকত্ব দেয়া ও ভোটার তালিকায় আনার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন।
ভোটার হওয়ার বিষয়ে কথা বলতেই ৬৮ বছরের গ্লানি মুছে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রোস্তম আলী বলেন, ‘এতদিন (৬৮টা বছর) অন্ধকারে ছিলাম। আমাদের কেউ ছিল না। কোনো নেতা ছিল না। রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন হয় নাই। এবারে বাংলা হইছে। রাস্তা হচ্ছে, স্কুল হচ্ছে। ভোটও দিম। খুব খুশি লাগছে মনটাতে।’
মনিন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘ছিটত যারা ছিলং। সগাই আন্ধারত আছলং। ভোটার হবার নাগছি। ভোট দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বার বানামো। উন্নয়ন করবে। আমরাও গরিব মানুষ। বয়সও ম্যালা হইছে। আমরা না পাইলেও ছোয়া পোয়া কিছু পাইবে।’
অন্যদিকে ২০১১ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ গণনায় যারা অন্তর্ভুক্ত হয়নি আপাতত তারা ভোটার হতে পারছেন না। হেড কাউন্টিংয়ের সময় অন্তত দুই হাজার অধিবাসী দেশের এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাজের সন্ধানে থাকায় যৌথ গণনায় অংশ নিতে পারেনি। তবে নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুস সরকার বলেন, হেড কাউন্টিংয়ে যাদের নাম রয়েছে, শুধু তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তারাই ভোটার হতে পারছেন।
এছাড়া দাসিয়ারছড়ার অনেকেই আগেই মিথ্যা পরিচয়ে বাংলাদেশি ভোটার হয়েছে। তাদের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে মাইগ্রেশন ফরম পূরণ করে নিজ স্থানে ফেরত আসার সুযোগ রয়েছে।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও জানান, ছিটমহলের সকল অধিবাসী যাতে ভোটার হতে পারে, সে বিষয়ে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। জটিলতার কারণে কেউ আগে কেউ পরে হবে। যারা হেড কাউন্টিংয়ে বাদ কিংবা নতুন করে কেউ আসতে চাইলে সে বিষয়টি দুই রাষ্ট্রের সরকার মহোদয় দেখবেন।
গত বছরের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মিলিত হয় ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল। দাসিয়ারছড়ায় ৬ হাজার ৫২৯ জন এবং ভুরুঙ্গামারীতে ১০টি ছিটমহলে ১ হাজার ২৩৮ জন অধিবাসী রয়েছেন। ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ অনুযায়ী দাসিয়ারছড়ায় ২ হাজার ৭৪০ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৩১৮ ও নারী ১ হাজার ৪২২ এবং ভুরুঙ্গামারীতে ২৯২ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ১৪৫ ও নারী ৪৭ জন ভোটার তালিকা ফরম পূরণ হয়েছে।
এমএএস/এবিএস/এমএফ