ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই বদলে যায় বরিশালের ৫৫টি গ্রাম

প্রকাশিত: ০১:২১ পিএম, ২৮ জুলাই ২০১৬

পেয়ারা পাল্টে দিয়েছে বরিশাল বিভাগের তিন জেলার ৫৫ গ্রামের চিত্র। এই এলাকার হাজার হাজার মানুষের কাছে পেয়ারা নিয়ে এসেছে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য, জীবিকার অবলম্বন। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা বর্ষায় এসব এলাকার নদী-খাল জুড়ে শুধু ‘ধবল’ পেয়ারার সমারোহ।

আষাঢ় পেরিয়ে ভাদ্রের সময় দূর-দূরান্তের বেপারিদের আনাগোনায় পেয়ারা মোকামগুলোতে রীতিমতো উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পেয়ারা বাগান সেই সঙ্গে এ ফলের স্বাদ নিতে বহু পর্যটকের এসব নদীপথে দেখা মেলে। পাকা পেয়ারার এক মদির গন্ধ চারদিকে।

Jhalkhathi

ছোট ছোট নৌকায় পেয়ারা চাষী, ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা পাইকারের ট্রলার, মালবাহী নৌকায় তুলে দেন। কোথাও ঝুড়ি ভরে বাছাই করা পেয়ারা ট্রাকে তুলে দেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে পেয়ারা এখানে মৌসুমি ফল, কৃষিজাত পণ্য শুধু নয়, প্রধান ব্যবসার অবলম্বন। পেয়ারার মৌসুম ঘিরে তাই ‘নাইওর’ আসে কন্যারা। পেয়ারা সবার কাছে নিয়ে আসে সাংবাৎসরিক উৎসব।

পেয়ারার সাম্রাজ্য

বরিশাল বিভাগের অন্যত্র ছিটে ফোঁটা পেয়ারা হলেও বরিশালের বানারীপাড়া, ঝালকাঠি সদর ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি ঘিরেই মূলত পেয়ারার বাণিজ্যিক চাষ। বরিশালের বানারীপাড়ার ১৬ গ্রামে ৯৩৭ হেক্টর, ঝালকাঠির ১৩ গ্রামে ৩৫০ হেক্টর জমিতে, স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামের ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হয়। এসব এলাকার মধ্যে ঝালকাঠির কীর্তিপাশা, ভিমরুলী, শতদশকাঠি, খাজুরিয়া, ডুমুরিয়া, কাপুড়াকাঠি, জগদীশপুর, মীরকাঠি, শাখা গাছির, হিমানন্দকাঠি, আদাকাঠি, রামপুর, শিমুলেশ্বর এই গ্রামে বৃহৎ অংশ জুড়ে বাণিজ্যিকভাবে যুগ যুগ ধরে পেয়ারার চাষ হয়।

স্বরূপকাঠির ২৬ গ্রামের মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতকাঠি, খায়েরকাঠি, ভদ্রানন্দ, বাচ্চুকাঠি, ভাংগুরা, আদাবাড়ী, রাজাপুর, ব্রাহ্মণকাঠি, ধলহার, জিন্দাকাঠি, আটঘর, কুড়িয়ানা, পূর্ব জলাবাড়ি, ইদিলকাঠি, আরামকাঠি, মাদ্রা, গণপতিকাঠি, আতাকাঠী, জামুয়া, জৈলশার, সোহাগদল, আদমকাঠী, অশ্বত্থকাঠী, সমীত, সেহাংগল, আন্দারকুল।

বরিশালের বানারীপাড়ার পেয়ারা বাগানগুলো হলো তেতলা, সৈয়দকাঠী, মালিকান্দা, ব্রাহ্মণবাড়ি, বোয়ালিয়া, জম্বুদ্বীপ, বিশারকান্দি, মরিচবুনিয়া, মুরার বাড়ি, উমরের পাড়, লবণ সড়া, ইন্দির হাওলা, নরেরকাঠি, রাজ্জাকপুর, হলতা, চুয়ারিপাড়। এসব গ্রামের কয়েক হাজার কর্মজীবী পরিবার যুগ যুগ ধরে পেয়ারার চাষ করছে।

পেয়ারার চাষ, ব্যবসা ও বাজারজাতকরণেও রয়েছে কয়েক হাজার মৌসুমী বেপারী এবং শ্রমিক। এসময় অন্তত কুড়িটি স্থানে পেয়ারা পণ্যের মৌসুমী মোকামের সৃষ্টি হয়। এগুলো হলো ভিমরুলী, আতাকাঠি, ডুমুরিয়া, গণপতিকাঠি, শতদশকাঠি, রাজাপুর, মাদ্রা, আদমকাঠি, জিন্দাকাঠি, বর্ণপতিকাঠি, আটঘর, কুড়িয়ানা, আন্দাকুল, রায়ের হাট, ব্রাহ্মণকাঠি, ধলহার, বাউকাঠী। এসব মোকামের মৌসুমে প্রতিদিন ৫/৭ হাজার মন পেয়ারা কেনাবেচা হয়ে থাকে।

Jhalkhathi

পেয়ারার আদি ইতিহাস

পেয়ার কবে থেকে এই মাটিতে এমন প্রশ্নে স্থানীয়রা জানান, শত শত বছর ধরেই তারা বংশানুক্রমে পেয়ারার চাষ করে আসছেন। তাদের মতে আনুমানিক ২০০ বছর আগে স্থানীয় কালীচরণ মজুমদার ভারতের ‘গয়া’ থেকে এই জাতের পেয়ারার বীজ এলাকায় রোপণ করেন। সেই থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে পেয়ারার চাষ।

Jhalkhathi

তবে প্রাচীন পেয়ারা চাষীরা জানালেন, আগে বিচ্ছিন্ন আবাদ হলেও ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হয়েছে পেয়োরার বাণিজ্যিক আবাদ। এই আবাদ ক্রমশ বাড়ছে। ২০১০ সালে অন্তত ১৯৩২ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক পেয়ারার আবাদ হয়েছে। এসময় ফলন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন পেয়ারা।

পেয়ারার চাষ

জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে ভাদ্রের শেষ এই তিন মাস পেয়ারার মৌসুম। তবে ভরা মৌসুম শ্রাবণ মাস জুড়ে। এরপর ক্রমশ কমতে থাকে পেয়ারার ফলন। চৈত্র বৈশাখের মধ্যেই পেয়ারা চাষীরা বাগানের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সাধারণত ছোট ছোট খাল/নাল দ্বারা বাগানগুলি মূলভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। চাষীরা মৃতপ্রায় গাছের ডাল কেটে, মাটি আলগা করে পেয়ারা গাছে আলাদা করে যত্ন নেয়। বাগানের চতুর্দিক জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নালা কেটে মাটি পেয়ারা গাছের গোড়ায় দেয়া হয়।

চাষীরা জানান, পেয়ারা গাছে তেমন কোনো সার বা আলাদা করে কিছু দেয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু পরিচর্যাই যথেষ্ট। সারা বছর তেমন কোনো কিছু করার দরকার হয় না। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসেই পেয়ারা গাছে ফুল আসতে শুরু করে। তবে বৃষ্টি শুরু না হলে পেয়ারা পরিপক্ক হয় না। জমি ভালো হলে হেক্টর প্রতি ১২/১৪ মেট্রিক টন পেয়ারার উৎপাদন হয়।

সবুজ আপেল যায় বিদেশেও

‘পেয়ারা’ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম শুধু নয় বিমানে পাড়ি দিয়ে ব্রাজিল, পর্তুগীজ, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, মালয়েশিয়াসহ দূরান্তে যাচ্ছে। তবে স্থানীয়দের হাতে নয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের গুটিকয়েক ব্যবসায়ীই এই লাভজনক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

Jhalkhathi

রায়ের হাটে পেয়ারার পাইকারী ব্যবসায়ী হারুন খান জানান, তিনি মোকাম থেকে সিজনে প্রতিদিন ৩/৪ মন পেয়ারা সিলেটে বড় ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠান। সেখান থেকে এই পেয়ারা যায় বিদেশে। শুধু রায়ের হাট নয় প্রতিটি মোকামেই বিদেশে পেয়ারা রফতানিকারকরদের এজেন্ট বাছাই করে পেয়ারা কিনে ঝুড়ি বা প্যাকিংজাত করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটের বিমান বন্দরে পাঠিয়ে দেয়।

বিদেশের বাজার শুধু নয় দেশীয় বাজারেও রসালো এই পেয়ারার চাহিদা অত্যাধিক। চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন সিজনে শত শত ট্রলার, নৌকা, ট্রাকে করে পেয়ারার চালান নিয়ে যায় ব্যবসায়ীরা।

ফলন কম, দুঃখ-দুঃখই

বছর পেয়ারার ফলন কম হয়েছে- এ তথ্য চাষী ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের। ফলন কম হওয়ায় পেয়ারা চাষী ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। পেয়ারার মুকুল আসার পর থেকে অনাবৃষ্টির কারণে মুকুল ঝড়ে যায়। জিন্দাকাঠির পেয়ারা চাষী রনজিৎ কুমার ক্ষোভের সঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ছবি দিয়া কি হইব? ছবি করলে গইয়াও লজ্জা পায়, বাঁচার পথ থাকলে হেইয়ার পদ্ধতি করেন।’

স্থানীয় চাষীরা জানান, মৌসুমে পেয়ারার দাম পড়ে যায়। বাগানে অনেক সময় প্রতি মণ পেয়ারা ৪০ টাকা মণ দরেও বিক্রি হয়। তখন দুঃখ-কষ্টে পেয়ারার নৌকাও ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয়রা জানান, কাপুড়কাঠি সুনীল মণ্ডলের পেয়ারার বড় বাগান রয়েছে। প্রতিদিন অন্তত ১০০ মণ পেয়ারা তার হাটে ওঠে। দাম পড়ে যাওয়ায় ৪০ টাকা মণ দরে পেয়ারা ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ১০ জন পাড়াইয়াকে (পেয়ারা বাগান পরিচর্যাকারী) রোজ দিতে হয় ৪ হাজার ৫০০ টাকা, পরিবহন ব্যয় মিলে প্রায় প্রতিদিনই লোকসানের শিকার হন।

শুধু সুনীল মণ্ডল নয়, সিজনের পাকা পেয়ারার ফলন নিয়ে বিপাকে গোটা পেয়ারা চাষীরা। সাধারণত ফল পাকলে গাছ থেকে ঝড়ে পড়ে। পেয়ারা সংরক্ষণের উপায় না থাকায় প্রতিদিন শত মন পেয়ারা পরে নষ্ট হয়ে যায়। প্রতি বছর জুলাইয়ের শেষ ১৫ দিন বাগানে পেয়ারার প্রতি মণপ্রতি দর ৪০ থেকে ৬০ টাকায় নেমে যায়। সাধারণত দর ভালো থাকলে বাগানে পেয়ারার মণ ১০০ থেকে ১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ভাদ্রের দিকে ফলন কমে গেলে ২৫০ টাকা পর্যন্ত এই দর ওঠে। তবে বাগান থেকে মোকামের মধ্যে পার্থক্য প্রচুর।

Jhalkhathi-

আগস্টের প্রথম দিকে বাগানে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা দরে পেয়ারার মণ হলেও মোকামে তা ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। খুচরা ব্যবসায়ীরা ২২০ থেকে ২৫০ টাকা দরে পেয়ারা কিনে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে শহরে খুচরা বিক্রি করে থাকে। বাগান থেকে ভোক্তা পর্যন্ত তিন হাত ঘুরে ১০ গুণ বেশি দামে পেয়ারা কিনে খেতে হয়।

এগ্রোবেইজড শিল্প না হওয়া

পেয়ারার জেলি পৃথিবী বিখ্যাত। বরিশালের উৎপাদিত পেয়ারার এই পার্সেন্টিজ অত্যন্ত বেশি। তাই বিদেশে মূলত এই পেয়ারা জেলি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে রফতানি হয়ে থাকে। জেলি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও দামি খাবার সত্ত্বেও পেয়ারা ঘিরে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো এগ্রোবেইজড শিল্প গড়ে ওঠেনি। ফলে উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণের অভাবে চাষীরা লোকসানে পড়ছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বিসিকের সহযোগিতা অথবা ব্যবসায়িক উদ্যোগে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন না হওয়ায় পেয়ারা ভর সিজনে দাম পায় না উৎপাদনকারীরা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও উন্নত হয়নি ভাগ্য

পোয়ারা উৎপাদক অঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থাও একটি বড় সমস্যা। চারিদিকে নদী-খাল-নালা-জলাভূমি থাকায় নির-বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কিন্তু দেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা সরবরাহ করার মতো সড়ক পথ উন্নত হয়েছে। কিন্তু ট্রাক, মিনি ট্রাক, পিকআপসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে সরবরাহ করা হচ্ছে পেয়ারা।

পেয়ারার অ্যানথ্রাক্স রোগ

দক্ষিণাঞ্চলে সিডর তছনছ করে দিয়েছে তার কৃষি ও মৎস্য সম্পদ তথা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। কিন্তু বরিশালের পেয়ারা চাষীদের কাছে সিডর এসেছে আশীর্বাদ নিয়ে। পেয়ারা চাষী পূর্ব ব্রাহ্মণকাঠি গ্রামের বাসিন্দা ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ মল্লিক জানান, সিডরের মত অ্যানথ্রাক্স (ছিট রোগ) উধাও। এক সময়ে ছিট রোগের কারণে পেয়ারা ফলন কমে এসেছিল কিন্তু সিডরের পর কোথাও এই রোগ দেখা যায়নি। কিন্তু এ বছর আবার পেয়ারায় অ্যানথ্রাক্স রোগ দেখা দিয়েছে। এই কারণে রোগাক্রান্ত পেয়ারা কিনতে চাচ্ছে না চাষীরা।

মুক্তিযুদ্ধে পেয়ারা বাগান

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বরিশাল অঞ্চলের স্বরূপকাঠি-ঝালকাঠি ও বানারীপাড়ার ৩৬ গ্রামের পেয়ারা বাগানের অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে এসব পেয়ারা বাগানে মুক্তিযোদ্ধারা ঘাঁটি গড়ে তুলে ও বহু অপারেশন চালায়। এর মধ্যে প্রথমেই নাম করতে হয় কুড়িয়ানার। অন্যান্য ঘাঁটিগুলো হল মাদ্রা, আতা, জিনুহার, ইদিলকাঠী, অশ্বত্থকাঠী, জামুয়া, ব্রাহ্মণকাঠি, বাউকাঠি, ভিমরুলী, জিন্দাকাঠিসহ বহু গ্রাম রয়েছে।

১৯৭১ সালে পেয়ারা বাগানের এই ৩৬ গ্রামে যাতয়াত বলতে ছিল একমাত্র নৌকা। দুর্গম যাতায়াতের কারণে এখানে বসে নিরাপদে থেকে অপারেশন চালানো সহজ ছিল। তৎকালীন সময়ে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির নেতা ‘সিরাজ সিকদার’ ‘ছালাম ভাই’ নাম দিয়ে আশে পাশে বিশেষ করে বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি, পিরোজপুর, ঝালকাঠিতে অপারেশন চালাতো। এছাড়া বেনীলাল দাশগুপ্ত ও ক্যাপ্টেন বেগের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ দুইটিও সক্রিয় ছিল।

ক্যাপ্টেন বেগ কুড়িয়ানা হাইস্কুলে ক্যাম্প গড়ে তোলেন অস্ত্র প্রশিক্ষণও দিতেন। মনিকা, বিথী, শোভা, শিখাসহ মেয়েদের সশস্ত্র গ্রুপটিকে তিনি ও বেনীলাল দাশগুপ্ত অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে এখানে মুক্তিযোদ্ধারা পাক-বাহিনীর স্পিডবোটে গুলী করলে স্পিডবোটটি ডুবে যায়। বোটের চালককে হত্যা করা হয়। স্পিডবোটটি পটুয়াখালীর তৎকালীন সামরিক প্রধান নাদির পারভেজের ছিল।

কুড়িয়ানার মুক্তিযোদ্ধাদের স্পিডবোট অপারেশনে আতঙ্কিত হয়ে পাক বাহিনী সে মাসে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে ৩৬ গ্রামে হামলার প্রস্তুতি নেয়। পাক বাহিনী কুড়িয়ানা হাইস্কুলে ক্যাম্প গড়ে তোলে। এখানে পাক বাহিনী ২১ দিন অবস্থান করে। এই ২১ দিনে পেয়ারা বাগানকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে। সে সময়ে ছারছিনা পীরের নির্দেশে নেছারাবাদ মাদরাসার ছাত্ররা ৩৬ গ্রামের পেয়ারা বাগান কেটে সাফ করে দেয়। মাদরাসার ছাত্র ছাড়াও পাক বাহিনীর হাতে ধৃত বন্দী মানুষদের পেয়ারা বাগান কাটার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যে পেয়ারা বাগান কেটে সাফ করা হয়।

পাক বাহিনী এই ২১ দিনের তিন দিনই স্পিডবোট নিয়ে একেকটি গ্রামে অগ্নিসংযোগ, হত্যা, লুণ্ঠনে মেতে উঠতো। ক্যাম্পে মেয়েদের ধরে এনে বীভৎস নির্যাতন চালাতো।

Jhalkhathi

প্রত্যক্ষদর্শী অনুপ বরণ চক্রবর্তী জানান, কুড়িয়ানা ক্যাম্পে অসংখ্য মেয়েদের ধরে এনে নির্যাতন আমি স্বচক্ষে দেখেছি- মেয়েদের কান্না-চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠতো।

পাক বাহিনী ২১ দিন এখানে অন্তত ৫/৭শ মেয়েদের ধর্ষণ করে। ক্যাম্পে থেকে প্রতিদিন ২০/২৫ জনকে শ্যামলাল শিকদারের জমির সংলগ্ন খালে ও কাছের ডোবায় গুলী করে ফেলে দিতো। স্বাধীনতার পর রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা এই ডোবা থেকে ১৭০টি মাথার খুলি উদ্ধার করে।

পেয়ারা শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩৬ গ্রামের পেয়ারার চাষ হলেও এই চাষ বর্তমানে ৫৫ গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। কাগজে কলমে ২০/২২ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের হিসাব থাকলেও হিসাবের বাইরে আরো কয়েক হাজার পেয়ারা উৎপাদন হয় বলে চাষী সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু অর্ধ-শতাধিক বছরের পুরোনো চাষ হলেও চাষী পর্যায়ে সংগঠিত রূপ না থাকায় মেলেনি কোনো সরকারি সহায়তা।

স্থানীয় পেয়ারা চাষী মুকুন্দ ঘরামী জানান, পেয়ারা চাষীরা চড়া সুদে এনজিওদের কাছ থেকে ঋণ নেয়। গত বছর থেকে কৃষি ব্যাংক সামান্য পরিমাণ ঋণ দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল সামান্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে- এ বছর পেয়ারা ও আমরা চাষী কল্যাণ সমিতি নামে একটি সমিতি গঠন করা হয়েছে। এই সমিতির মাধ্যমে ঋণ চাওয়া হলে ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিলেন অগ্রণী ব্যাংকের ডিজিএম তোফাজ্জেল হোসেন। তবে চাষী পর্যায়ে সংগঠন এখন কার্যক্রম শুরু করতে না পারায় এগোতে পারছে না।

স্থানীয় প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলেও বিনিয়োগকারীরা এখানে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

এআরএ/পিআর