EN
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

যার আলোয় আলোকিত ঠাকুরগাঁও

প্রকাশিত: ১১:২১ এএম, ০৬ আগস্ট ২০১৬

কথায় বলে, ধ্যানের চর্চা হয় গুহায়, ধর্মের চর্চা হয় মসজিদ-মন্দিরে, নীতির চর্চা হয় পরিবারে, বিদ্যার চর্চা হয় বিদ্যালয়ে অর্থাৎ জাগতিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শিক্ষা লাভের স্তর ভেদে আমরা এদের বলি বিদ্যালয়, কলেজ এবং মহাকলেজ ইত্যাদি। এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে আমরা যে জ্ঞান বা শিক্ষা লাভ করি তার নাম ফর্ম্যাল বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

এমনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠাকুরগাঁওয়ের শতবর্ষী বিদ্যাপিঠ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়।

১১২ বছর ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি। এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এখনো ওই বিদ্যালয়ে ছাত্র পরিচয় দিতে অনেকে গর্ববোধ করেন।

Thakurgaon

বিদ্যালয়ের ইতিহাস
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। বিদ্যালয়টি ঠাকুরগাঁও শহরের প্রাণকেন্দ্রে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। বিদ্যালয়টি শুরুতে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে সেনুয়া-টাঙ্গন নদীর মিলনস্থলের সন্নিকটে অবস্থিত জমিদার বাড়ির পাশে এম ই (মিডিল ইংলিশ) স্কুলরূপে অতিবাহনের পর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ১ মার্চ ওই স্থানেই এইচ ই (হায়ার ইংলিশ) স্কুলে পরিণত হয়।

আলী মোহাম্মদ সরকার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বহু বছর পর্যন্ত এর সহকারী সেক্রেটারি পদে দায়িত্বে ছিলেন। ১৯০৪ সালে স্কুলটিকে এইচ ই স্কুলে (উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে) রূপান্তরের ক্ষেত্রে রাজশাহী বিভাগের তদানীন্তন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস Mr. Hall ward বিশেষভাবে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

টাঙ্গন নদীর তীরে প্রথম প্রতিষ্ঠিত মাইনর স্কুলটিতে একটি খড়ের আটচালা ঘর ছিল। উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর স্কুলসংলগ্ন জমিদার কাচারির একটি বড় দালান স্কুলের কাজে অনেকদিন ব্যবহৃত হয়। ওই স্থানে সংকুলান না হওয়ায় স্কুলটি স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। স্কুল স্থানান্তরের নিমিত্তে বর্ধমানের কুসুম গ্রাম জমিদারির তৎকালীন জমিদার বিবি তৈয়বা খাতুন ১০ বিঘা সাড়ে ১৫ কাঠা জমি দান করেন।

Thakurgaonঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯০৭ সালের ধারণকৃত ছবি

ওই জমির ওপর ১৯০৬-১৯০৮ সালের মধ্যে স্কুলের সুদৃশ্য ও সর্ববৃহৎ ভবন (বর্তমান প্রশাসনিক ভবন) নির্মিত হয় এবং ১৯০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্কুলটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ওই জমিদারির সুযোগ্য উত্তরাধিকারী সৈয়দ বদরুদ্দোজা আরো ২৫ বিঘা জমি দান করেন। এরপর স্কুলের নতুন হোস্টেল নির্মাণ ও সম্প্রসারণের জন্য আরো এক একর জমি ১৯৬০-১৯৬৩ সালের মধ্যে হুকুমদখল সূত্রে আয়ত্ত করা হয়।

১৯০৪ সালের ১ মার্চ স্কুলটি (এইচ ই স্কুল) উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠিত হলে এর পরিচালনা পর্ষদের প্রথম প্রেসিডেন্ট (সভাপতি) হয়েছিলেন দিনাজপুর জেলার তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট F.J.Jeffries.

তিনি স্কুলটি উচ্চ বিদ্যালয় রূপে প্রতিষ্ঠার পূর্বে এম ই স্কুলেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯০৮ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরাই পদাধিকার বলে এই স্কুলের প্রেসিডেন্ট এবং ১৯০৪ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের এস ডি ও গণপদাধিকার বলে সেক্রেটারি ছিলেন।

১৯১০ থেকে ১৯১৮ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের এস ডি ও গণপদাধিকার বলে এ স্কুলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত হতেন।

এরপর ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের এস ডি ও গণপদাধিকার বলে এ স্কুলের প্রেসিডেন্ট মনোনীত হতেন। মাঝে ১৯০৪ সালে এই নিয়মের ব্যত্যম ঘটিয়ে মহকুমা ইন্সপেক্টর অব স্কুল আব্দুল জব্বার এই স্কুলের সভাপতি হয়েছিলেন। তার পরবর্তীকালে এস ডি ও গণ পুনরায় এর সভাপতি মনোনীত হতেন।

Thakurgaon-Jila-School
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরাতন গেট

স্কুলটির মঞ্জুরির জন্য ১৯০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা হলেও ১৯১০ সালের শেষ দিকে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি লাভ করেন। তখন থেকে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের মুন্সেফগণ পদাধিকার বলে এ স্কুলের সেক্রেটারি মনোনীত হতেন।

পরবর্তী প্রাদেশিকীকরণের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকগণ পদাধিকার বলে সেক্রেটারি মনোনীত হতেন। ১৯৮৪ সালের ১ ফ্রেরুয়ারি ঠাকুরগাঁও মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হলে পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসকগণ সভাপতি এবং স্কুলের প্রধান শিক্ষকগণ সেক্রেটারি মনোনীত হয়ে আসছেন।

বিদ্যালয়ের নামকরণ
১৮৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ের এম.ই. স্কুলটি ১৯০৪ সালে এইচ.ই. স্কুলে উন্নীত হলে স্কুলটির নাম হয় ঠাকুরগাঁও এইচ.ই. স্কুল। এরপর ১৯০৬ সাল থেকে রাজশাহী বিভাগের তদানীন্তন কমিশনার Mr. Marindine-এর নামানুসারে স্কুলটির নামকরণ হয় Marindine H.E.School পরবর্তীকালে এই নাম পরিত্যক্ত হয় এবং স্কুলটি ‘ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল’ নামে পরিচিত হয়।

১৯৬৭ সালের ১ আগস্ট স্কুলটি প্রাদেশিকীকৃত (সরকারি) হলে এটি ‘ঠাকুরগাঁও গভঃ হাই স্কুল’ অর্থাৎ ঠাকুরগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নামে অভিহিত হয়। বর্তমানে ‘ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত।

Thakurgaon-Jila-School

১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁও মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হলে স্থানীয়ভাবে স্কুলটি ‘ঠাকুরগাঁও জেলা স্কুল’ নামে পরিচিতি পায়। তবে এই শেষোক্ত নাম সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই বর্তমানে সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচালিত বিদ্যালয়টি।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অভিমত
ঠাকুরগাঁওয়ের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. আবু মোহাম্মদ খয়রুল কবির জাগো নিউজকে বলেন, এই স্কুলে পড়ালেখা করে আজ আমি ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করছি। আমাদের স্কুলের ছাত্ররা অনেকে ভালো জায়গায় চাকরি করছে। এখনো আমরা গর্বের সঙ্গে বলি আমরা ঠাকুরগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আশা রাখি এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে। যুগ যুগ শিক্ষা দান করুক বিদ্যালয়টি।

ঠাকুরগাঁওয়ের বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও’র নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান  জাগো নিউজকে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ কল্যাণ বিভাগের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। কারণ আমি ভালো ফলাফল করেছিলাম ঠাকুরগাঁও জিলা স্কুলের কারণে। এই বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশ চালিকায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এগিয়ে গিয়েছে ঠাকুরগাঁও বর্তমান সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়। ধরে রাখবে শত বছরে ঐতিহ্য।

এছাড়াও এই বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন অনেকেই। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইস্রাফিল শাহীনসহ অসংখ্য গুণী মানুষ।

বর্তমান শিক্ষার্থীদের মতামত
বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্র সাজিদ আল রেজা জানায়, জেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠে পড়তে পেরে আমি গর্বিত। এখান থেকে পাশ করে অনেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যলয়ে অধ্যায়ন করছেন। আমিও চাই ভালো ফলাফল করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে।

১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী এ.কে কাফী জানায়, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে তুমি কোন স্কুলের ছাত্র। তখন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র বললে নিজের মধ্যে খুবই তৃপ্তি পাই। আগামীতে ভালো ফলাফল অর্জন করে দেশকে জানিয়ে দিতে চাই আমি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র।

এছাড়াও গত ১০ যাবত ধরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে শতভাগ পাস ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সেরা স্থান দখল করে আছে।

শিক্ষকদের কথা
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. তাফিম জানান, বাংলাদেশের কয়েকটি পুরাতন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় একটি। আমি এই স্কুলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে পেরে গর্ববোধ করি।

কাদিমুল ইসলাম জাদু জানান, এটি আমার স্কুল। এটাই আমার পরিচয়। এই বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী একদিন দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দিবে বলে মনে করছি।

PhotoGallery
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের  পুরাতন ভবন

শিক্ষাবিদদের মন্তব্য

প্রফেসর মনতোষ কুমার দে জানান, ঠাকুরগাঁও হাই স্কুল সেই আগে থেকেই শিক্ষার মানের দিক দিয়ে এগিয়ে ছিল। শুনেছি এ বছর বাংলাদেশের সেরা বিদ্যাপীঠের সম্মাননা পেয়েছে। আগামীতে এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোনার বাংলা গড়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটাই প্রত্যয়।

ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আইয়ূর আলী জানান, মানুষ গড়ার কারিগর এই বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়টির শত বছর পার হলেও শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ে নাই। প্রতি বছরই ভালো ফলাফল করছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার মান আরো বৃদ্ধির জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান সাবু জানান, আমি এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। এখন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক এটার উপর আর গর্বের কিছু হতে পারে না। এই বিদ্যালয়টি মানুষ গড়ার কারখানায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সুশীল সমাজ ও দক্ষ জাতি গঠনের লক্ষে সুশিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত গুণাবলীর সার্বিক বিকাশ সাধন, মূল্যবোধ সৃষ্টি ও মানসিক উৎকর্সতার বৃদ্ধি ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের দেশ প্রেমিক আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য কাজ করে যাচ্ছে।

ম্যানিজিং কমিটির সভাপতির বক্তব্য
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, আমি এই জেলায় প্রায় ৪ বছর যাবত কর্মরত থেকে বিদ্যালয়ের ম্যানিজিং কমিটির দায়িত্বে রয়েছি। খুবই সুনামের সঙ্গে জেলার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে শিক্ষকরা। এ বছর জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে বিদ্যালয়টি। আশা রাখি এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

এমএএস/এবিএস