ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

বেনাপোলে অধিকাংশ ক্রেন অচল : মালামাল খালাসে স্থবিরতা

প্রকাশিত: ০৭:১১ এএম, ০৯ আগস্ট ২০১৬

দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দরের অধিকাংশ ক্রেন ও ফর্কলিফট অকেজো হওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে বন্দরের মালামাল খালাস প্রক্রিয়া। আমদানিকারকরা বন্দর থেকে সময়মতো তাদের পণ্য খালাস করতে না পারায় বন্দরে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ পণ্যজট।

বন্দরের গুদাম থেকে পণ্য বের করার পর নতুন পণ্য ঢোকাতে হচ্ছে। জায়গার এ সঙ্কটের কারণে পণ্য বোঝাই ট্রাক বন্দরের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে থাকছে দিনের পর দিন। ট্রাক থেকে পণ্য নামানোর অনুমতি মিললেও ক্রেন মিলছে না। ফলে জায়গা ও ক্রেন সঙ্কটে বিপাকে পড়েছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

বন্দরের একটি সূত্র জানায়, দেশের সিংহভাগ শিল্প-কলকারখানা, গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ ও বিভিন্ন প্রকল্পের বেশির ভাগ মেশিনারিজ আমদানি করা হচ্ছে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে। কিন্তু ক্রেন ও ফর্কলিফট ছাড়া এ জাতীয় পণ্য বন্দরে আনলোড ও বন্দর থেকে খালাস নেওয়া সম্ভব নয়।

মংলা বন্দর থেকে ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের পর অতি পুরাতন ক্রেন ও ফর্কলিফট মংলা বন্দর থেকে ভাড়া করে এনে এখানে কাজ চালানো হয়।
 
২০১০ সালের ২১ মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দরের পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঢাকার মহাখালীর মেসার্স এসআইএস (সীস) লজিস্টিক্যাল সিস্টেমের (জেভি) পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি হয়। ১ আগস্ট থেকে তারা বেনাপোল স্থলবন্দরে বেসরকারি কার্গো হ্যান্ডলিং এর দায়িত্ব পায়। তারা বন্দরে ১৬টি ফর্কলিফট ও ৫টি ক্রেন দিয়ে মালামাল ওঠানামার কাজ করার পর ওই বছরের ১০ নভেম্বর আরো ৬টি নতুন ফর্কলিফট নিয়ে আসে।

কিন্তু কয়েকদিন কাজ করার পর এসব ফর্কলিফট ও ক্রেণ অকেজো হওয়া শুরু করে। চুক্তি অনুযায়ী পাঁচটি ক্রেন দিয়ে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ করার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তিনটি ক্রেন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বিষয়টি নিয়ে এক মাস আগে চিঠি দেয়া হলেও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেননি স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের ঢাকা অফিসের কর্তা ব্যক্তিরা।
 
Benapole-Port

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) নিতাই চন্দ্র সেন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বারবার তাগিদ দিলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাতে সাড়া দিচ্ছে না। বিষয়টি জানিয়ে গত ২৫ মে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের (বাস্থবক) কাছে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে।
 
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ বন্দরে একটি মাত্র ২৫ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ফর্কলিফট রয়েছে, পাঁচ টনের ফর্কলিফট রয়েছে পাঁচটি, এর মধ্যে তিনটি থাকে সার্বক্ষণিক অচল। ৪০ টনের ক্রেন রয়েছে একটি, ৩৫ টনের একটি, ১০ টনের দুটি ও ১৯ টনের একটি। এসব ক্রেন অধিকাংশ সময় অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় ২৫ টনের ফর্কলিফটি অকেজো থাকায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটছে মালামাল লোড-আনলোডে।  

বন্দর ব্যবহারকারী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, বন্দরের ড্রাইভার ও ইঞ্জিনিয়ারদের যোগসাজশে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব ফর্কলিফট ও ক্রেন ইচ্ছাকৃতভাবে অচল করে রাখেন দিনের পর দিন। মাঝেমধ্যে মেরামতের জন্য যেসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয় তার অধিকাংশই পুরনো। ফলে মাস না ঘুরতেই ফের তা অচল হয়ে পড়ে। বন্দরে যেসব ক্রেন ও ফর্কলিফট ব্যবহার করা হচ্ছে তার অধিকাংশই ভাড়া করা ও পুরাতন। এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো রকম দায়সারা গোছের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

বন্দরের ১১ নম্বর গুদামের ইনচার্জ ফারুক হাসান জানান, পণ্য ওঠানামার কাজে ব্যবহৃত পাঁচটি ক্রেনের মধ্যে দুটি সচল রয়েছে। ওই দুটি দিয়েই কোনো রকমে কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ক্রেন সঙ্কটের কারণে রাত ১২টার পরও কাজ করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধিরা ক্রেন পেলেও গুদামে আর জায়গা থাকছে না। তখন ভেতরের পণ্য বের না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকতে হচ্ছে।
   
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বেনাপোল প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান বলেন, ইঞ্জিনের বিষয় তো, মাঝেমধ্যে সমস্যা হতে পারে। আমরা সব ক্রেন ঠিক করে দিচ্ছি।

বেনাপোল বন্দরে গুদাম রয়েছে ৩৬টি। ওপেন ইয়ার্ড ৫টি, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড ১টি, ট্রাক টার্মিনাল আমদানি ২টি ও রফতানি ১টি। এসব গুদামে পণ্য ধারণক্ষমতা ৪৭ হাজার মেট্রিক টন। কিন্তু সব সময়ই বন্দরে ৭০ থেকে ৮০  হাজার মেট্রিক টন পণ্য মজুদ থাকে। ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ মালামাল ঝুঁকি নিয়ে রাখা হচ্ছে ঠাসাঠাসি করে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল রাখার জন্য একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদামসহ ১৫টি গুদাম নির্মাণের দাবি জানান। এছাড়া দুটি এক্সপোর্ট শেড ও একটি ছাউনিযুক্ত ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য ও ডেঞ্জারাস কার্গোর নামে আয়ুর্বেদিক সামগ্রী, ইসবগুলের ভুসি, পশুখাদ্য, লেখার কালি ইত্যাদি পণ্যের ওপর ২০০ শতাংশ হারে অতিরিক্ত মাশুল আদায় বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছে বন্দর ব্যবহারকারীরা।

বন্দরে জায়গা সঙ্কটের কথা স্বীকার করে বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) আবদুল জলিল বলেন, আধুনিক দুইটি শেড নির্মাণ করার জন্য ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। শেডগুলো হলে জায়গার কোনো সঙ্কট থাকবে না। ক্রেনের সঙ্কট মেটানোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার জানানো হচ্ছে। কিন্তু তারা গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ বিষয়ে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক লতা জানান, বন্দরের জায়গা ও ক্রেন সমস্যার সমাধান না করলে বেনাপোল বন্দর থেকে ব্যবসায়ীরা অন্য বন্দরে চলে যাবেন।
 
তিনি আরো জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় বেনাপোল বন্দরের সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এফএ/পিআর