চামড়া পাচার রোধে সীমান্তে সতর্কতা
ফাইল ছবি
যশোরের শার্শার শিকারপুর, কাশিপুর, গোগা, বেনাপোলের পুটখালি, দৌলতপুর, সাদীপুর, ঘিবা সীমান্তকে কুরবানির পশুর চামড়া পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত করে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
অধিক মুনাফার আশায় কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী চামড়া সীমান্তপথে ভারতে পাচার করে দেয়। এ বছর দেশের চামড়া ভারতে পাচার রোধে হার্ডলাইনে রয়েছে প্রশাসন। ব্যাপকহারে এবার চামড়া পাচার হতে পারে ব্যবসায়ীদের এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে সীমান্তরক্ষীদের পাশাপাশি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশও।
ঢাকার পর দেশে পশুর চামড়ার সবচেয়ে বড় মোকাম যশোরের রাজারহাট। সেখানে দুই শতাধিক আড়তে ২১ জেলার ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ মোকামের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ১০ হাজার মানুষ। প্রতি কোরবানির ঈদে রাজারহাটে প্রায় ২০ কোটি টাকার চামড়া কেনাবেচা হয়। ঈদের পর সীমান্তপথে চামড়া পাচার বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।
অত্যধিক গরমে পচে যাওয়া, লবণের দাম বৃদ্ধি আর ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধে টালবাহানা এই তিন কারণে এবার কুরবানির পশুর চামড়া ভারতে পাচার হয়ে যেতে পারে এমনই আশঙ্কার কথা জানালেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট রাজারহাটের ব্যবসায়ীরা। এই ব্যবসায়ীরাই গত কয়েক বছর ভারতে চামড়া পাচার রোধে সোচ্চার ছিলেন। এবার নিজেরাই পাচারের আগাম ধারণার কথা বলছেন।
রাজারহাট চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. আশরাফ আলী জানান, ঢাকা, নাটোর, ঈশ্বরদী, পাবনা, কুষ্টিয়া ঝিনাইদহসহ দেশের নানা প্রান্তের পাইকাররা রাজারহাটে আসেন চামড়া কিনতে। তারা প্রধানত ঢাকায় ট্যানারিতে চামড়া সরবরাহ করেন। কিন্তু রাজারহাটের প্রায় ৩০০ ব্যবসায়ীর প্রায় ১০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।
তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা টাকা না দিলে এবার ভারতে চামড়া পাচার হয়ে যেতে পারে।
সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মোমিনুল মজিদ তুষার বলেন, গত বছর একটা চামড়ার পেছনে ৭০-৭৫ টাকার লবণ লাগত। এবার দেড়শ` থেকে দুইশ টাকা লাগবে। গত বছর ৭০ কেজি লবণের বস্তা ছিল সাড়ে পাঁচশ টাকা এবার তা ১৪শ টাকায় উঠেছে।
বেনাপোলের চামড়া ব্যবসায়ী মনির হোসেন, জামতলার নজরুল ইসলাম শাহাজী ও নাভারনের ইয়াকুব আলীও একই ধরনের কথা বলেন। তারা বলেন, সরকার চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের ঋণ দিলেও সেই অর্থের পুরোটা তারা ব্যয় করেন না।
এছাড়া স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা ঋণ পান না। কোরবানির সময় তাদের হাতে টাকা থাকে না। ফলে সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়া হয়। তখন বেশি দামের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বেছে নেন সীমান্তের চোরাইপথ।
বাগআঁচড়ার চামড়া ব্যবসায়ী শেখ সহিদুল ইসলাম বলেন, পেশাদার চামড়া ব্যবসায়ীদের পুঁজি সংকটের সুযোগ নেয় চোরাকারবারিরা। পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে তারা বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে চামড়া সংগ্রহ করে। পরে সুযোগ বুঝে পাচারকারীদের কাছে সেই চামড়া তুলে দেয়।
বেনাপোলের দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত খুলনা ২১ বিজিবি। এ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুর রহমান দৌলতপুর, পুটখালি ও গোগা সীমান্তের ইছামতি নদী দিয়ে চামড়া পাচারের আশঙ্কা থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, চামড়া পাচার ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়তি সতর্কতা, সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ানোসহ নদীতে টহলের ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।
শার্শার সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে চামড়া পাচার রোধে ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং তল্লাশি চৌকি স্থাপনের কথা জানিয়েছেন বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান।
তিনি জানান, সীমান্তে বিজিবি ও র্যাবের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি সীমান্ত অভিমুখে চামড়া বোঝাই যান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী পুলিশ ফাঁড়িগুলোকেও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বেনাপোল সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যশোর ২৬ বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর লিয়াকত হোসেন। তিনি বলেন, সীমান্তের সব বিওপি ক্যাম্পকে সর্তক থাকতে বলা হয়েছে। ঈদের দিন বিকেল থেকে অতিরিক্ত টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সীমান্ত দিয়ে সাইকেল, ভ্যান, নমিমন, করিমন বা যে কোনো পন্থায় চামড়া নিয়ে সীমান্তে যাতে যেতে না পারে সে ব্যাপারে সীমান্তের সব বিওপি ক্যাম্পকে টহল বৃদ্ধি করাসহ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অবশ্যই চামড়া বহনকারী ব্যক্তি বা বাহনের গতি হবে বাজারমুখী বা যশোরমুখী।
একই কথা বলেন খুলনা ২১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফুল হক।
শার্শা উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভায় চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম মঞ্জু।
জামাল হোসেন/এসএস/এমএস