ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

দর্শনার্থী বরণে প্রস্তুত কুমিল্লার বিনোদন কেন্দ্রগুলো

জেলা প্রতিনিধি | প্রকাশিত: ০৬:০৯ এএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দে দর্শর্থীদের জন্য কুমিল্লার বিনোদন কেন্দ্রগুলো বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র ধর্মসাগরের উত্তর পাড়ে সিটি শিশু পার্কটি ভিন্ন আঙ্গিকে সাজানো হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় এক যুগের অধিক সময় ওই শিশু পার্কটি শিশুদের বিনোদনের জন্য অবহেলিত থাকলেও ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাইডস সংযোজনের মাধ্যমে সোমবার এর উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী আ.ক.ম বাহা উদ্দিন বাহার ও সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু।

কবি নজরুল, রবি ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী ও সঙ্গীত সাধক বাবু শচীন দেব বর্মনের স্মৃতি বিজড়িত দেশের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী প্রাচীন ও ঐতিহ্যমণ্ডিত জেলা কুমিল্লা। ঐতিহ্যে-আভিজাত্যে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত থাকার কারণে গোমতী বিধৌত কুমিল্লার সুনিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঐতিহাসিক প্রাচীন নির্দশনসহ বিভিন্ন কারণে সমগ্র দেশ-বিদেশের জ্ঞান পিপাসু পর্যটকদের কাছে কুমিল্লা ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

এ জেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অনেক বিনোদন কেন্দ্র। তাই এবারের ঈদে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। এদিকে, বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে লালমাই পাহাড়। এটি উত্তর-দক্ষিণে ১১ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২ মাইল চওড়া। লাল মাটির এ পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫০ ফুট। লালমাই পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায় উঠে অনায়াসেই কুমিল্লা শহরকে দেখা যায়। এই পাহাড় এলাকা এবং এর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অনেক প্রাচীন নিদর্শন।

comilla

লালমাই পাহাড়ের পাশে রয়েছে শালবন বিহার। পূর্বে এই প্রত্নস্থানটি শালবন রাজার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। কিন্ত খননের পর ১১৫টি ভিক্ষুকক্ষ বিশিষ্ট ৫৫০ বর্গফুট পরিমাপের একটি বৌদ্ধ বিহারের ভূমি নকশা উন্মোচিত হয়েছে। তাই এটাকে শালবন বিহার হিসেবে নামকরণ করা হয়। বিহারটিতে ৪টি ও কেন্দ্রীয় মন্দিরে ৬টি নির্মাণ যুগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই বিহার খননে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ প্রত্নবস্তু ময়নামতি জাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে।

কুমিল্লা মহানগর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে ময়নামতি (কোটবাড়ি) অবস্থিত। এখানে অষ্টম শতকের পুরাকীর্তি রয়েছে। ১৯৫৫ সালে এখানে খনন কাজ শুরু হয়ে এখনো চলছে খনন, পাওয়া যাচ্ছে অনেক প্রাচীন নিদর্শন। এখানকার বিভিন্ন স্পটের মধ্যে শালবন বিহার ও বৌদ্ধ বিহার অন্যতম।

শালবন বিহার দেখার পর ৩ মাইল উত্তরে রয়েছে কুটিলামুড়া। এখানে তিনটি বৌদ্ধ স্তূপ আছে। এর ভিত্তি বেদিগুলো চার কোণাকার। কুটিলামুড়া দেখার পর এটি থেকে প্রায় দেড় মাইল উত্তর-পশ্চিমে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় অবস্থিত চারপত্র মুড়া। প্রায় ৩৫ ফুট উঁচু একটি ছোট ও সমতল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান। যা পূর্ব-পশ্চিমে ১০৫ ফুট লম্বা ও উত্তরে-দক্ষিণে ৫৫ ফুট চওড়া ছিল। পাহাড়পুর বিহারের পরই এর স্থান। এছাড়াও রয়েছে রূপবান মুড়া ও কুটিলা মুড়া। এখানে রয়েছে ময়নামতি যাদুঘর। জাদুঘরের পাশে বন বিভাগ নতুন ২টি পিকনিক স্পট করেছে।

comilla

১৯৫৯ সালে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড) প্রতিষ্ঠিত হয়। বার্ডের ভেতরের নয়নাভিরাম দৃশ্য ছাড়াও রয়েছে নীলাচল পাহাড়। তাছাড়া দু’পাহাড়ের মাঝখানে রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর বনকুটির। যা পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়।

কুমিল্লার লাকসাম, বরুড়া ও সদর থানার ত্রিমুখী মিলনস্থলে লালমাই পাহাড়ের শীর্ষ দেশে চন্ডি মন্দিরদ্বয় অবস্থিত। এলাকাটি চন্ডিমুড়া হিসেবে পরিচিত। ত্রিপুরাধিপতির বংশধর দ্বিতীয়া দেবী প্রতিষ্ঠিত চন্ডি মন্দিরদ্বয় ১৩শ’ বছরের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। প্রাচীন তাম্রলিপি অনুযায়ী জানা যায়, সমতট রাজ্যটি স্থাপন করার সময় মন্দির দু’টি নির্মিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা-সিলেট সড়কের পাশে ময়নামতি সেনানিবাসের উত্তরে অবস্থিত। সকাল ৭টা-১২টা এবং ১টা-৫টা পর্যন্ত সেখানে পর্যটকরা ভিড় জমায়। এছাড়াও একটি অন্যতম পিকনিক স্পট। এখানে ব্রিটিশ, কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান, আফ্রিকান, জাপানি, আমেরিকান এবং ভারতীয় মিলে ৭৩৭ জন সৈন্যের সমাধি রয়েছে।

comilla

কুমিল্লা-সিলেট রোডের কুমিল্লা বুড়িচংয়ের সাহেববাজারে রানীর বাংলো অবস্থিত। এখানকার দেয়ালটি উত্তর-দক্ষিণে ৫১০ ফুট লম্বা ও ৪০০ ফুট চওড়া। এখানে স্বর্ণ ও পিতল নির্মিত দ্রবাদি পাওয়া গেছে।
 
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণের লালবাগ নেমে সামনে ২ কিলোমিটার দূরেই রাজেশপুর ফরেস্ট। এখানে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী নোম্যান্স ল্যান্ড রয়েছে। সেখানকার সবুজ অরণ্যে পাখির কিচির-মিচির শব্দ শুনতে প্রতিদিন পর্যটকরা ভিড় জমায়। বর্তমানে বন বিভাগ এর অনেক উন্নয়ন করায় পর্যটকরা আকৃষ্ট হচ্ছে।

পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ময়নামতি-কোটবাড়ি এলাকায় বনবিভাগ নানা স্থাপনা ও উন্নয়ন করেছে। বেসরকারি উদ্যোগে নগরীর রাজাপাড়া এলাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বিভিন্ন নান্দনিক স্থাপর্ত্য শিল্পের আদলে প্রতিষ্ঠা করেছে নুরজাহান ইকো পার্ক। সেখানে মাত্র ১০ টাকার টিকেটে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমায়। এর অদূরেই ঢুলি পাড়া-রাজাপাড়া সড়কের পাশে শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে ফান টাউন।  

comilla

বাদশাহ আওরঙ্গজেবের ভাই শাহজাদা সুজার নাম অনুসারে সুজা মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কুমিল্লা মহানগরীর মোগলটুলিতে এর অবস্থান। ১৬৫৭ সালে প্রাচীন স্থাপত্যের আদলে এ মসজিদ নির্মাণ করা হয়।

মহানগরীর বাদুরতলার পাশে ধর্মসাগর অবস্থিত। প্রায় সাড়ে ৫শ’ বছর আগে রাজা ধর্মমানিক্য এটি খনন করেন। এর আয়তন ২৩.১৮ একর। চারদিকে বৃক্ষশোভিত একটি মনোরম স্থান। এর পশ্চিম ও উত্তর পাড় সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। এর উত্তর পাড়ে সিটি শিশু পার্কটি শিশুদের জন্য নতুন করে সাজিয়ে ঈদুল আজহার দিন থেকে খুলে দেয়া হয়েছে।

নগরীর এলজিইিডি রোডে ভাষা সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবহুল বাড়ি, নবাব বাড়িতে শচীন দেব বর্মন, কবি নজরুল এবং অভয়াশ্রমে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতি বিজরিড় স্থান পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। কবি নজরুল-নার্গিসের বাসর শয্যা থেকে শুরু করে অনেক স্মৃতি বিজড়িত স্থান দেখতে পর্যকটরা আগমন করছে কবি তীর্থ জেলার মুরাদনগরের দৌলতপুরে।

comilla

হযরত শাহজালালের সফরসঙ্গী শাহ জামালসহ মোট ৩০ জন আউলিয়ার মাজার রয়েছে দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে। এখানে অবস্থিত কবরগুলো প্রায় ৭শ’ বছরের পুরনো। এখানে ৩০টি কবর আছে। দেবিদ্বারের গুনাইঘর গ্রামে রয়েছে নান্দনিক কারুকার্য  সম্বলিত গুনাইঘর বায়তুল আজগর সাত গুম্বজ জামে মসজিদ।

জেলার লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে ডাকাতিয়া নদীর তীরে নারী জাগরণের পথিকৃৎ নবাব ফয়জুন্নেছার বাড়ি। কুমিল্লাবাসীর সুখ-দুঃখের সাথী গোমতী নদী। মহানগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহমান এ গোমতী নদীর তীরে ঈদেও ছুটিতে পর্যটকদের ঢল নামবে।  

এছাড়া কুমিল্লা সদর উপজেলা মিলনায়তনের পাশে কেটিটিসির পর্যটন কেন্দ্র। এছাড়াও নগরীতে মহাত্মা গান্ধী ও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুলের স্মৃতি বিজড়িত কুমিল্লার স্থানগুলোতেও পর্যটকরা ভিড় জমায়।

comilla

কুমিল্লা চিড়িয়াখানা অনেকটা পশু শূন্য থাকলেও মৃতপ্রায় ওই চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেনেও ঈদে পর্যটকদের ঢল নামে। কুমিল্লায় পর্যটকদের জন্য থাকার সুব্যবস্থা হিসেবে কুমিল্লা বার্ড, জেলা পরিষদ রেস্ট হাউজ ও ডাক বাংলো, নজরুল ইনস্টিটিউট, হোটেল রেড-রফ-ইন, হোটেল নূরজাহান, ময়নামতি, কিউ প্যালেস, রানীর কুটির, আশিক ও সোনালী নামের আবাসিক হোটেল রয়েছে।

সেই সঙ্গে নগরী ও মহাসড়কের পাশে খাবারেরও ভালো আয়োজন রয়েছে এ কুমিল্লায়। হোটেল মিয়ামী, মায়ামী, কাকলী, জিহান, হাইওয়ে ইন,ডায়না, ডলি রিসোর্ট, বাঙলা রেস্তোরাঁ, কাস্মীরী বিরিয়ানী হাউজ, গ্রিন কেস্টলে, কস্তুরী, কিং ফিশার, কফি হাউজসহ রয়েছে অসংখ্য ভালমানের খাবারের হোটেল।

বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন জানান, ঈদের দিন সকাল থেকে ঈদের ছুটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নগরী ছাড়াও জেলার অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র এবং দর্শকদের সমাগম হয় এমন স্পটে পুলিশসহ সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের নজদারি থাকবে।

এসএস/এমএস