গদবাধা আয়োজনে কক্সবাজারে বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপন
চলছে পর্যটন বর্ষ। তাই সবার আকাঙ্ক্ষা ছিল দেশীয় পর্যটনের প্রধান গন্তব্য খ্যাত সৈকত নগরী কক্সবাজারে এবার ব্যতিক্রমী কোনো আয়োজনে উদযাপিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস। আশায় গুড়েবালি। প্রতিবারের মতোই গদবাধা আয়োজনে ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়েছে।
বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি ও জেলা প্রশাসনের যৌথ আয়োজনের মাঝে ছিল প্রতি বছরের মতো হোটেল-মোটেল-গেস্ট হাউস ও কটেজ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে র্যালি। শিক্ষার্থীদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পিঠা উৎসব, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও গালগল্প শুনানোর আলোচনা সভা। বিকেলে চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে বের করা র্যালি সড়ক প্রদক্ষিণ করে লাবণী পয়েন্টে সৈকতের মুক্তমঞ্চে এসে শেষ হয়। র্যালিতে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, হোটেল ব্যবসায়ী সমিতি, হোটেল মালিক, কটেজ ব্যবসায়ী সমিতি, ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন, ফটোগ্রাফার অ্যাসোসিয়েশন, বিচবাইক মালিক সমিতিসহ নানা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন সেবিরা অংশ নেন।
পরে লাবণী পয়েন্টের বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে বিশ্ব পর্যটন দিবসের শুভ উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন। এরপর প্রতিবারের মতো লোক দেখানো সৈকত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, পিঠা উৎসব ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা চালানো হয়।
পরে উন্মুক্ত মঞ্চে পর্যটন দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. সিরাজুল মোস্তফা, কক্সবাজার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ফজলুল করিম চৌধুরী, টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফজলে রাব্বি, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য রেজাউল করিম ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কাজী আব্দুর রহমান প্রমুখ।
আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে `ক` (নার্সারি-৩য়), ‘খ’ (৪র্থ-৬ষ্ঠ) ও ‘গ’ (৭ম-১০ম শ্রেণি পর্যন্ত) এ তিন বিভাগে ২৬০ জন প্রতিযোগি অংশ নেন। এতে প্রত্যেকটি বিভাগ থেকে ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকারিদের পুরস্কৃত করা হয়।
পরে বিকেল ৪টা থেকে লাবণী পয়েন্টের উন্মুক্ত মঞ্চে আয়োজন করায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে গান করেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের রাজা ‘হেডমাস্টার’ খ্যাত সিরাজুল ইসলাম আজাদ, বুলবুল আক্তারসহ অর্ধশতাকি শিল্পী।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, গত কয়েক বছর ধারাবাহিক এসব অনুষ্ঠান আয়োজন হয়ে আসছে। কিন্তু এসব অনুষ্ঠান পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে না।
তারা আরো বলেন, কোনো দিবস আসলে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি মিটিংয়ে ডেকে ক্যাটাগরী অনুসারে হোটেল-মোটেল থেকে চাঁদা আদায় করে থাকে। দিবসটি কমিটির ফান্ডে টাকা জমানোর লক্ষ্য নিয়ে আসার মতো হয়। কারণ যে টাকা উঠে তার এক তৃতীয়াংশও খরচ করা হয় না।
র্যালিসহ সমগ্র আয়োজনে অংশ নেয়া হোটেল-মোটেল ও অন্যরা নিজ খরচে সবাই অংশ নিয়ে চলে যায়। এতে দিবস পালিত হয় সত্যি, কিন্তু পর্যটনের কোনো উপকার বা প্রসার হয় বলে মনে হয় না।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি যাই করুক কিছু বলা যাবে না। যে প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি এসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা করবে তাকে বেকায়দায় ফেলানোর সমস্ত কার্যক্রম নিরবে করা হয়। তাই সরকার ঘোষিত পর্যটন বর্ষ ২০১৬ কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করছেন এখানকার পর্যটন সংশিষ্টরা।
তাদের মতে, ঘোষণার শুরুতেই প্রচারণা চালিয়ে কেবল মাত্র একটি বিচ কার্ণিভালের আয়োজন করা হলেও বিগত ৯ মাসে দৃশ্যমান আর কোনো কর্মকাণ্ড পর্যটন উন্নয়নে করেছে বলে কেউ দেখেননি।
আবার যদিও কোনো কোম্পানির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে তা সকল গণমাধ্যমকে জানানো হয় না। প্রশাসনের তাবেদারি কিংবা নানা নিয়মে অনিয়মে সহযোগিতাকারি গণমাধ্যমকর্মীদেরই কেবল আমন্ত্রণ জানিয়ে কোন মতে আয়োজনটা শেষ করা হয়। তাই সব গণমাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্রীক অনুষ্ঠানগুলো প্রচার না পাওয়ায় ঘোষণার ৯ মাস পর পর্যটন বর্ষের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
কক্সবাজারের তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের চেয়ারম্যান এম এন করিম বলেন, সরকার ঘোষিত পর্যটন বর্ষের মূল টার্গেট ছিল বিদেশী পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণ মুখী করা। কিন্তু এ আয়োজনের মাধ্যমে কক্সবাজারে বিদেশী পর্যটক আগমণ বেড়েছে এমনটি দাবি করা যাবে না। দেশীয় যা পর্যটক এখানে আসছে তাও নিজেদের তাগিদে। পর্যটন এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ যথার্থ নই।
বিদেশী কিংবা দেশী পর্যটকদের স্বল্প ব্যয়ে আসা-যাওয়া-খাওয়া ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় স্পট উন্নয়ন করা গেলে কেবল পর্যটন বিকাশ সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এসব ব্যাপারে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমেদ বলেন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে পর্যটন দিবসের আয়োজন সম্পর্কে তিনি অন্ধকারে। তাই অনুধাবণ করা যায় অতীতে পর্যটন বিকাশ কিংবা উন্নয়নে সমন্বয় ছিল না। এসব বিষয়ে যখন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পূর্ণ দায়িত্ব নিলে সমন্বিত প্রয়াসে কাজ করা হবে।
এ ব্যাপারে জানতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনের সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সায়ীদ আলমগীর/এআরএ/আরআইপি