অয্ত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে চড়ারহাটের গণকবরগুলো
দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মহাসড়ক সংলগ্ন প্রাণকৃষ্ণপুর (চড়ারহাট) ও আন্দলগ্রাম (সারাইপাড়া) সবুজ ছায়া সুনিবিড় শান্ত দুটি গ্রাম। এই গ্রাম দুটিকে ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর ভোরে অশান্ত করে তুলেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
তখন মসজিদে ফজরের আজান দিচ্ছেন মুয়াজ্জিন। ঘুম ভাঙা চোখে গ্রামবাসীর প্রথম দৃষ্টি পড়ে হানাদার বাহিনীর উপর। শত শত হানাদার গোটা গ্রাম ঘেরাও করে মেশিনগান এসএমজি তাক করে রাখলে গ্রামবাসীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। প্রাণে বাঁচার শেষ আশ্রয় হিসেবে প্রায় সবাই ছুটে যান গ্রামের একমাত্র মসজিদে।
অন্যদিকে, একদল পাক হানাদার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বৃদ্ধ, যুবক, কিশোর নারীদের ধরে এনে গ্রামের উত্তর পূর্ব কোণের মাঠে সমবেত করে। পাকবাহিনী রাস্তায় মাটি কাটার কথা বলে মসজিদের লোকজনকে একই স্থানে নিয়ে আসে। এরপর নির্দেশ দেয় সবাইকে কলমা পড়ার জন্য। আতঙ্কিত গ্রামবাসী কলেমা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপর শুরু হয় ব্রাশ ফায়ার। ভোরের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে এক সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিরীহ বৃদ্ধ, যুবক, কিশোর ও নারী।
এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞে প্রাণকৃষ্ণপুরে (চড়ারহাট) ৫৭ জন, আন্দলগ্রামে (সারাইপাড়া) ৩১ জন, বেড়ামলিয়ায় ১ জন, আহম্মদনগরে ৩ জন, নওদা পাড়ায় ১ জন, শিবরামপুরে ১ জন, চৌঘরিয়ায় ১ জন, আমতলায় ১জনসহ দুইজন নারীসহ নাম ও ঠিকানা বিহীন অনেক নিরীহ মানুষ শহীদ হন। এসব শহীদের মধ্যে ৯৮ জনের মরদেহ সনাক্ত করা যায়।
বাকীগুলো শনাক্তকরণ ছাড়াই দাফন করা হয়। তাদের ভাগ্যে জোটেনি এক টুকরো কাফনের কাপড়ও। শুধু মশারি, কাঁথা ও শাড়ি-লুঙ্গি দিয়ে একই কবরে ৪-৫ টি করে লাশ দাফন করা হয়। পুকুর পাড়ে সেই গণকবরগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা বিলীন হয়ে গেছে।
সেদিন হানাদারদের কাছ থেকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ডা. এহিয়া মন্ডল, আ.হামিদ, মোজাম্মেল হক মাস্টার, ডা. আবুল কালাম, আ. রশিদসহ ১১ জন এখনো সেই ভয়াল নারকীয়তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছেন।
সরকারিভাবে স্বাধীনতার ৩৯ বছরেও কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ না হওয়ায় ৪০ বছরের মাথায় পার্শ্ববর্তী হাকিমপুর থানার মুক্তিযোদ্ধা অজিত কুমার রায় নিজের বসতবাড়ি বিক্রি করে চড়ারহাটের বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
তার এই মহানুভবতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সে সময়ের নবাবগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও বর্তমান এমপি শিবলী সাদিক, বিরামপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুল আলম রাজু, হাকিমপুর উপজেলাে সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, ঘোড়াঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী শুভ রহমান ও চড়ারহাটের বিশিষ্ট ডা. আবুল কালাম ইট, সিমেন্ট ও অর্থ দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে এগিয়ে আসেন। কৃষক নওশের আলী মন্ডলের দানকৃত জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে চড়ারহাট শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।
সে সময়ের টগবগে যুবক আজকের বৃদ্ধ হাসান আলী (৭০) একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি পেশায় একজন কাপড় ব্যবসায়ী। চড়ারহাট গণহত্যার বিষয়ে কথা বলতে গেলে তিনি প্রথমে কথা বলতে রাজী হননি। পরে নিজের রাগ অভিমান বাদ দিয়ে হরহর করে বলতে শুরু করেন সেই দিনের কথা। বললেন ভাগ্যচক্রে নিজের বেঁচে যাওয়ার কথা। বললেন হতাশার কথা।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, সেই স্বাধীনতার পর থেকেই তো বলে আসছি। কই কিছু তো হয় না। যেটুকু হয়েছে তা তো কেবল ব্যক্তি প্রচেষ্টায়। সরকার তো কিছুই করলো না। নিহত ও আহত পরিবারগুলো এখনো পর্যন্ত পায়নি কোনো মর্যাদা বা সহায়তা। অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে আছে গণকবরগুলো। তিনি স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে দিবসটি পালনের আহ্বান জানান।
১৯৭১ সালের ১০ অক্টবোর ভোরে হানাদারদের হাত থেকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া ডা. এহিয়া মন্ডল (৭৬) জানান, সরকার এ গণহত্যায় নিহতদের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃৃতি প্রদান ও যথাযথ পুনর্বাসন করা, আহতদের যুদ্ধাহত হিসেবে স্বীকৃৃতি প্রদান করা এবং অত্র এলাকায় শহীদদের স্মরণে চড়ারহাটে শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করার জোর দাবি জানায়।
যে কারণে এ হত্যাযজ্ঞ
১৯৭১ এর ৩ অক্টেবর চড়ারহাটের পথ ধরে গরুর গাড়িতে করে ৮ জন পাকসেনা বিরামপুরের দিকে আসার পথে বিরামপুর থানার বিজুল ও দিওড় গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে মুক্তিবাহিনী ৭ পাকসেনাকে হত্যা করে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে একজন পালিয়ে গিয়ে পাক সেনাদের ক্যাম্পে খবর দিলে পাক সেনারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
পালিয়ে যাওয়া ওই পাকসেনার ভুল নিশানার কারণে দিওড় গ্রামের পরিবর্তে আন্দোলগ্রাম-চড়ারহাট গ্রামে পাক হানাদাররা গণহত্যা চালিয়ে ১৫৭ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে। চড়ারহাটের গণকবরটির সীমানা বেষ্টনী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেই হত্যাযজ্ঞের দু’মাস পর দেশ স্বাধীন হয়। শহীদদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে এলাকাবাসী চড়ারহাটে শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় ও শহীদ স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
এদিকে, সোমবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় চড়ারহাটের ১৯৭১ সালে গণহত্যার স্মৃতিসৌধে উপজেলা প্রশাসন, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও বিরামপুর ও ঘোড়াঘাটের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের পক্ষ্যে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
শহীদদের রূহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও দোয়া এবং ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হবে। বাদ জোহর চড়ারহাটসহ আশপাশের গ্রামের শহীদ পরিবারের সদস্য ও গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া আহতরাসহ সর্বস্তরের এলাকাবাসী নিহতদের স্মরণে বিশেষ দোয়া করবেন।
এসএস/এবিএস