বড়পুকুরিয়ার কয়লা ধোয়া পানি থেকে ছড়িয়ে পড়ছে চর্মরোগ
প্রায় দুই মাস ধরে হাতে চর্মরোগে (চুলকানি) আক্রান্ত আট বছরের শিশু রিভা। বাবা ইদ্রিস আলী মেয়ের হাতের রোগটি সারাতে ইতোমধ্যে অনেক টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু এখনো তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব হয়নি।
বাড়িতে পানির সরবরাহ না থাকায় রিভা তার কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে বাড়ির পার্শ্ববর্তী ডোবায় হাত ধুতে গিয়েছিল। আর সেখান থেকেই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান রিভার বাবা ইদ্রিস আলী।
রিভা দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের ইউসুফপুর গ্রামের ইদ্রিস আলীর মেয়ে। সে ওই এলাকার রজনীগন্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
শুধু রিভাই নয়, ওই এলাকার বেশ কয়েকজন এই চর্মরোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে ওই এলাকার চাষী ও দিনমজুররা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ক্ষেতে কাজ করার ফলেই তারা এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে অনেকেরই ধারণা। তবে চর্মরোগ নয়, ওই এলাকার মূল সমস্যা পানি সংকট। যে পানি বাড়িতে না থাকার ফলে রিভাকে যেতে হয়েছিল পার্শ্ববর্তী ডোবায়।
রিভা যে গ্রামে বাস করে সেই ইউসুফপুর গ্রামটি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাত্র ৩ থেকে ৪০০ মিটারের মধ্যে। 
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র সচল রাখতে কেন্দ্রে ১৪টি গভীর পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। যেগুলো দিয়ে অনবরত পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। যাতে করে ওই এলাকার নলকূপ দিয়ে পানি উঠছে না। ফলে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার পড়েছে ওই এলাকায়। এই তীব্র পানির সংকট শুধুমাত্র ইউসুফপুর গ্রামেই নয়, কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী ফুলবাড়ী ও পার্বতীপুর উপজেলার মোট ১১টি গ্রামে।
গ্রামগুলো হচ্ছে-ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের রামভদ্রপুর, মধ্যরামভদ্রপুর, মধ্যদুর্গাপুর ইউসুফপুরের দুইটি ও দুধিপুুকুরের তিনটি গ্রাম এবং পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের শেরপুর, উত্তর শেরপুর ও মধ্যমপাড়া গ্রাম।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, মোট ১১টি গ্রামের প্রত্যেকটিতে ২০০ করে পরিবার রয়েছে। পাশাপাশি তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে যে পানি ব্যবহার করা হয় সেই সব পানিই ময়লাযুক্ত হয়ে ড্রেনের মাধ্যমে চলে আসে পার্শ্ববর্তী কৃষি জমি ও নদীতে। আর এসব পানি শরীরের সংস্পর্শে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় চুলকানিসহ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়। এই কেন্দ্রের উৎপাদন সচল রাখতে মোট ১৪টি গভীর নলকূপের (ডিপ) মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। এই পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ করে সেখানে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। অনবরত ভূগর্ভস্থ থেকে পানি উত্তোলনের ফলে কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী এসব এলাকায় পানির সংকট দেখা দেয়।
গত ২০০৯ সাল থেকে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করলে সেই সময়ে এলাকাবাসী আন্দোলনে নামলে পল্লী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) তদন্ত করে গভীর নলকূপ বসিয়ে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে পানি সরবরাহ শুরু করে।
সরেজমিনে ইউসুফপুর গ্রামে গেলে সাংবাদিকদের দেখে সমস্যার কথা জানাতে গ্রামের অনেকেই এগিয়ে আসেন। সেখানে কথা হয় ফজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি নিজেও বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের একজন কর্মচারী। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর ধরে তাদের গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। অনেকেই এসেছেন তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
সর্বশেষ সমাধান হিসেবে যা হয়েছে তাতে সন্তুষ্ট নন তারা। কারণ এখন তাদের পানি কিনে খেতে হয়। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থায়নে ও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে ওই এলাকায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে করে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমিকে জনপ্রতি মাসে ১২ টাকা দিতে হয়।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লা ধোয়া যে পানি বের হয় তা ড্রেনের মাধ্যমে পড়ে স্থানীয় তুলাই নদীতে। স্থানীয় ভোজন রায় জানান, কয়লা ধোয়া এসব দূষিত পানি নদীতে পড়ে নদীর পানিও দূষণ হচ্ছে। এতে করে নদীর মাছ মরার ঘটনা না ঘটলেও ওই নদীতে যে মাছের উৎপাদন হয় তা খাওয়ার উপযুক্ত নয়। ওই মাছের মধ্যে এক ধরনের গন্ধ হয়। 
ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল ইসলাম জানান, দূষিত পানির কারণে চর্মরোগের বিষয়টি তিনি অবগত, তবে এটি এখনো বড় আকার ধারণ করেনি। তবে মাঠ পর্যায়ে তাদের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. অমলেন্দু বিশ্বাস জানান, দূষিত পানির ফলে চর্মরোগের বিষয়টি তিনি একেবারেই জানেন না। সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাও তাকে কিছুই অবগত করেননি। তবে যদি এটি হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি নিজে বিষয়টি তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান।
১৪টি গভীর পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে বিষয়টি স্বীকার করেন বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (নিরাপত্তা) হযরত আলী।
তিনি জানান, পার্শ্ববর্তী যেসব গ্রামে পানির সংকট দেখা দিয়েছে সেগুলোতে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থায়নে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কয়লা ধোয়া যে পানি বের হয় তার পরিবেশগত কোনো সমস্যা নেই। বরং এই পানি যে জমিতে পড়ে তার ফসল উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এই এলাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার ফলে এসব এলাকার লোকজনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের অনেকটাই চাহিদা পূরণ করছে।
তবে এলাকার কতিপয় লোকজন বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে মিথ্যা ষড়যন্ত্রমূলক কথা বলছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এমদাদুল হক মিলন/এআরএ/পিআর