মির্জাপুরে মৃত ব্যক্তিরাও পাচ্ছেন ১০ টাকা কেজির চাল!
ফাইল ছবি
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় সরকারের খাদ্যবান্ধব ১০ টাকা কেজির চাল নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
ডিলার ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট উপজেলার ১৫ হাজার হতদরিদ্রের জন্য বরাদ্দকৃত ১০ টাকা কেজির চাল কালোবাজারে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে যেমন খাদ্যবান্ধব এ কর্মসূচির নির্দেশ উপেক্ষিত হচ্ছে, তেমনি সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ।
ডিলার, সিন্ডিকেট ও গুটিকয়েক দলীয় সমর্থক শুধু এ সুবিধা ভোগ করছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে এ ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ৩নং ফতেপুর ইউনিয়নের ছয়জন মেম্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিত অভিযোগও করেছেন।
পরবর্তীতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওই ইউনিয়নের এমারত নামে এক ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া বানাইল ইউনিয়নের এক ডিলারকে জরিমানাও করা হয়।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই মাসে মির্জাপুর উপজেলার ১৪ ইউনিয়নে দরিদ্রদের জন্য ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে তালিকা চাওয়া হয়। এ তালিকা মোতাবেক মহেড়া ইউনিয়নে ১০৪৬ জন, জামুর্কিতে ১২৯০, ফতেপুরে ৮০২, বানাইলে ৯০২, আনাইতারাতে ৯৬০, ভাদগ্রামে ৮৫২, ওয়ার্শিতে ১০৪৬, বহুরিয়াতে ৪১২, ভাওড়ায় ৭০৫, লতিফপুরে ৬৫০, গোড়াইতে ২২২০, আজগানাতে ১২৬৯, তরফপুরে ৮৯৩ এবং বাঁশতৈল ইউনিয়নে ১১৪৭ জন।
তালিকা অনুযায়ী এ উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ১৯৪ জন কার্ডধারী পরিবার রয়েছে। যারা ১০ টাকা কেজি দরের চাল পাবে।
উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের এই কার্ডধারী পরিবারগুলোর মধ্যে চাল বিতরণের জন্য ২৮ জন ডিলার ও ২৮ জন ট্যাক কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলেও এ সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
উপজেলাবাসীর অভিযোগ, সম্পূর্ণ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে এই ডিলার ও ট্যাক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এদের সবাই ক্ষমতাসীন দলের। এ কারণে তারা সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবে ২০১১ সালের তালিকা থেকে তাদের নিজেদের পছন্দমতো নামের তালিকা প্রণয়ন করেছে।
উপেক্ষা করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণের তালিকা। যাদের নামের বিপরীতে কার্ড নেয়া হয়েছে তারা অনেকেই এ বিষয়ে অবহিত নন। এছাড়াও তারা মৃত, বিত্তশালী ও দলীয় লোকজনদের নামে এই কার্র্ড নিয়েছে বলেও অভিযোগ সুবিধা বঞ্চিতদের। আর এ কারণে বাদ পড়েছেন ইউনিয়নগুলোর অসংখ্য অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের লোকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, খাদ্য অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্যাক কর্মকর্তা আর ডিলারদের নিয়ে তৈরি হয়েছে একটি সিন্ডিকেট। উপজেলার হতদরিদ্র মানুষকে ঠকিয়ে এ সিন্ডিকেট বরাদ্দকৃত ১০ টাকার চাল কালো বাজারে বিক্রিতে সক্রিয় রয়েছে। অতিরিক্ত ফায়দা লুটতে এ সিন্ডিকেট উপজেলার মৃত, বিত্তবান ব্যক্তিদের নামেও করেছে কার্ড। এছাড়া উপজেলার দুই একটি ডিলার কিছুকিছু চাল বিতরণ করলেও সেখানে দেয়া হচ্ছে ৩০ কেজির স্থলে ২০-২২ কেজি চাল।
এ অনিয়মের সর্বোচ্চ সত্যতা পাওয়া গেছে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে। ইউনিয়নগুলো মধ্যে রয়েছে ৭নং ওয়ার্শি, ৫নং বানাইল, ৩নং ফতেপুর,৮নং ভাদগ্রাম যা নব গঠিত ভাওড়া ইউনিয়ন, ২নং জামুর্কি, ১নং মহেড়া, ৬নং আনাইতারা ও ১১নং আজাগানা।
ওয়ার্শি ইউনিয়নের মসদই গ্রামের হতদরিদ্র ব্যক্তি আয়নাল (৫৬), মস্তমাপুর গ্রামের আদুরী বেগম (৫০), চন্দনতারা গ্রামের লিলি বেগম (৪৫), সাফর্তা গ্রামের ওবায়দুলসহ (৪৭) বেশ কয়েকজনের অভিযোগ, ইউনিয়নের ডিলার তাদের স্বাক্ষর নিলেও এখন পর্যন্ত তাদের এক ছটাক চালও দেয়নি। ডিলার ফরহাত আলী খান শাহীন উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা। এ প্রভাবে তিনি হতদরিদ্রের জন্য বরাদ্দকৃত চাল অবাধে কালো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ প্রসঙ্গে ৭নং ওয়ার্শি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মাহবুব আলম মল্লিক হুরমহল অভিযোগ করে বলেন, এ ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণে ডিলার ব্যাপক অনিয়ম ও কারসাজি করছেন। কার্ডধারীদের চাল না দিয়ে ডিলার শাহীন ও তার সহযোগিরা গরিবের চাল কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
বানাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শামীম মিয়ার অভিযোগ, তার ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজির চাল কার্ডধারীদের না দিয়ে ডিলারগণ প্রকাশ্যেই কালো বাজারে বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এছাড়াও ডিলারের বিরুদ্ধে এ ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মৃতদের নামে কার্ড বরাদ্দ দিয়ে সেই চাল বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. একরামুল হক প্রামাণিক বলেন, কর্মকর্তার অভাবে তাকে টাঙ্গাইল সদর, বাসাইল ও মির্জাপুর উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ কারণে তিনি ডিলারদের কার্যক্রম ঠিকমতো তদারকি করতে পারছেনা। তবে সরকারের এ খাদ্য বান্ধব ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণে অনিয়ম হলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুম আহমেদ বলেন, সরকারের খাদ্য বান্ধব ১০ টাকা কেজি চাল বিতরণে যদি কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় তবে তদন্ত করে ওই ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করাসহ তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইতোমধ্যেই এ অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের এক ডিলারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও বানাইল ইউনিয়নের এক ডিলারকে জরিমানা করা হয়।
এমএএস/আরআইপি