জামায়াতের নতুন আমিরের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নতুন আমির মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার দুপুর থেকে ফেনীর দাগনভূঞার জয়লস্কর ইউনিয়নের উত্তর লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় যায় প্রতিনিধি দল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহকারী পরিচালক মো. নরুল ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধি দলটি দিনব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১১ জুলাই পাক-হানাদার বাহিনীর দোসর শান্তি কমিটির ফেনী অঞ্চলের প্রধান সংগঠক মকবুল আহমাদের নির্দেশে লালপুর গ্রামের রাজাকাররা সাহাব উদ্দিন, বদিউর জামান ও লাতু মিয়ার নেতৃত্বে হানাদার বাহিনী লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছে এমন সংবাদের পর ওই গ্রামে আভিযান চালায়। এসময় তারা হিন্দু পাড়ায় অবস্থান করা মুক্তিযোদ্ধা আনা মিয়াকে গুলি করে হত্যা করে এবং হিন্দু পাড়ায় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
হানাদার বাহিনীর সদস্যরা ওই পাড়ার নারায়ণ চন্দ্র দে, মতিলাল দাস, বিপন পাল, দিলিপ চন্দ্র পাল, হরলাল পাল, কালীপদ ঘোষ, ধীরেন্দ্র কুমার ভৌমিক, তার ছেলে অমৃত লাল ভৌমিক, প্রিয়তোষ দাস ও নরেন্দ্র কুমার দাসকে হাত ও চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে ফেনীর সিও অফিস এলাকায় তৎকালীন পাক-হানাদার ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।
পরদিন তাদের দিয়ে মাটির গর্ত খুঁড়ে ১০ জনকে একসঙ্গে ব্রাশফায়ার করে মাটি চাপা দেয় বলে দাবি করেছেন তাদের সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধা খোকন চন্দ্র পাল ও নিহতদের পরিবার। তদন্ত কমিটির কাছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে শহীদ পরিবারের সদস্যরা বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
শহীদ নারায়ণ চন্দ্র দের স্ত্রী সুরুচি বালা দে (৭০) তার স্বামী হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে বলেন, তিনি এখনো তার স্বামীকে খুঁজছেন। স্বামীকে খুঁজতে গিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্বামীকে খুঁজে পেতে ভিটেবাড়ি টুকুও বিক্রি করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৫ বছরেও তাদের কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা খোকন চন্দ্র পাল জানান, পাড়ার এই হত্যাযজ্ঞ বর্ণনা দিয়ে বিভিন্ন সময় সরকার প্রধান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদে বারবার আবেদন করেছেন। কিন্তু সরকার বা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ তাদের এ আবেদনে কোনো সাড়া দেয়নি। এ সকল পরিবারকে শহীদদের তালিকাভুক্তি বা তাকেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করেননি। অনেক পরে হলেও বর্তমান সরকারপ্রধান এ শহীদের হত্যার বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও জেলা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এজন্য বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ফেনী মহাকুমার শান্তি কমিটির অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মকবুল আহমাদ। তার দায়িত্ব ছিল রাজাকার আল-বদর ও আল শামসের সমন্বয় করা।
জামায়াতের আমির মকবুল আহমাদের গ্রামের বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ওমরাবাদ গ্রামে। তিনি ফেনী শহরে অবস্থিত সেন্ট্রাল হাইস্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।
জামায়াতের বর্তমান আমির মকবুল আহমদ ১৯৯১ সালে ফেনী-২ (ফেনী সদর-দাগনভূঞা) আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। ভোট পান সর্বসাকুল্যে ২০ হাজার।
মকবুল আহমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াত নেতা মকবুল আহমাদের নির্দেশে ফেনী কলেজের সাবেক ভিপি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনকে ফেনী থেকে ধরে নিয়ে চট্টগ্রামে অজ্ঞাত স্থানে হত্যা করা হয়। তারপর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওয়াজ উদ্দিনের লাশের হদিস পায়নি তার স্বজনরা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি ফেনী শহরের তাকিয়া বাড়ি।
ফেনী জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মীর আবদুল হান্নান একাত্তরের মুক্তিকামী মানুষের রক্তের দাগে রঞ্জিত মকবুলের শাস্তির দাবি করেছেন।
‘৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের আমির মকবুল আহমাদ রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। তারই নির্দেশে ফেনীর স্থানীয় রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মুক্তিযোদ্ধা মাওলানা ওয়াজ উদ্দিনকে ফেনী থেকে ধরে চট্টগ্রামে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, জামায়াত নেতা মকবুল আহমাদের নেতৃত্বে রাজাকার, আল-বদর স্বাধীনতা যুদ্ধে ফেনীর মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, মালামাল লুটপাট, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা এবং নারীদের ধর্ষণসহ অসংখ্য জঘন্য কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটায়।
দাগনভূঞা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শরীয়ত উল্যাহ বাঙ্গালী বলেন, যুদ্ধকালীন একই উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের লালপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ায় আগুন দিয়ে ১০ হিন্দু ও এক মুসলমানকে মকবুল আহমাদের নির্দেশে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর হত্যাকারীরা বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে জেনে আনন্দিত হয়েছি।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সহকারী পরিচালক মো. নরুল ইসলাম বলেন, আমরা বিষটি নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত শুরু করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে বসেছি, তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ওই দিনের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছি। তদন্তের স্বার্থে অন্য কিছু মন্তব্য করা যাবে না।
জহিরুল হক মিলু/এআরএ/আরআইপি
সর্বশেষ - দেশজুড়ে
- ১ কুমিল্লায় প্রতীক বরাদ্দের দিনই শোডাউন, প্রার্থীকে জরিমানা
- ২ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন মারা গেছেন
- ৩ শাকসু নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে নোয়াখালীতে শিবিরের বিক্ষোভ
- ৪ ময়মনসিংহ বিএনপি-বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ-গুলি
- ৫ তারেক রহমানকে নিয়ে কটূক্তি করায় দিনাজপুরে যুবক গ্রেফতার