ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

দাদনের টাকা পরিশোধ করতে ইটভাটায় যোগ দিচ্ছে শিশুরা

প্রকাশিত: ০১:২৫ পিএম, ১১ নভেম্বর ২০১৬

সাতক্ষীরায় বাড়ছে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা। আর ঝরে পড়া এসব কোমলমতি শিশুদের দিয়ে করানো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। যে বয়সে তাদের বই, খাতা, কলম থাকার কথা সেই বয়সে তাদের করতে হচ্ছে হাড় ভাঙা খাটুনি।

এদিকে, শ্রমিক সর্দার ও ইট ভাটা মালিকদের প্রলোভনে পড়ে দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা শিশু সন্তানদের এ কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে যাচ্ছে। আর বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা।

মাত্র আট বছর বয়সী ফিরোজ হোসেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের টেংরাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। টেংরাখালী গ্রামের রাশিদুল সরদারের ফিরোজ ১৫ অক্টোবর সোমবার বাড়ি ছেড়ে গোপালগঞ্জের এক ইটের ভাটায় যায় কাজের জন্য।

শ্রমিক সর্দার রেজাউল ইসলামের নিকট থেকে দুই মাস পূর্বেই চব্বিশ হাজার টাকা নেয় তার পরিবার। দাদন হিসেবে নেয়া ওই টাকা পরিশোধের জন্য আগামী ছয় মাস প্রখর রোদ্রের মধ্যে ইট উল্টানোর হাড় ভাঙা খাটুনির কাজে পাঠানো হয়েছে আট বছরের ফিরোজকে।

ভেটখালী গ্রামের কুঞ্জলাল কাহারের ছেলে দিপংকর কাহার নুতনঘেরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। লেখাপড়া বন্ধ করে পরিবার তাকেও পাঠিয়েছে বরিশাল এলাকার এক ইট ভাটায়।

ফিরোজ কিংবা দিপংকর নয় বরং টেংরাখালী গ্রামের শামিম হোসেন, আব্দুল হালিম, কাশিমাড়ীর নাসিম, ঈশ্বরীপুরের হাসান আলী, জাহিদুল, তরিকুল, ভটখালীর আছাদুল, রোকন, আমির হামজা, নুতনঘেরী এলাকার উদয়, আল-আমিনসহ  কয়েক`শ শিশুকে ইট ভাটার শ্রমিক হিসেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে। যাদের বেশির ভাগেরই শেষ হয়নি প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ।

শ্রমিক সর্দার রেজাউল ইসলাম বলেন, ইট উল্টানো, কাঁদা তৈরিসহ অপেক্ষাকৃত কম পরিশ্রমের কাজে শিশুদের লাগানো হয়। এসব কাজে পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকদের যে মজুরী দিতে হয় একই পারিশ্রমিকে পাঁচ শিশু পাওয়া যায়। শ্রমিক সর্দার ও ইট ভাটা মালিকদের প্রলোভনে পড়ে দরিদ্র পরিবারের অভিভাবকরা শিশু সন্তানদের এ কাজে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে কোমলমতি শিশুরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে যাচ্ছে। আর বাড়ছে আশঙ্কাজনকহারে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা।

টেংরাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কাশেম জানান, শ্রমিক সর্দারদের প্রলোভনে পড়ে তার বিদ্যালয়ের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ১২ জন শিশুকে তাদের পরিবার লুকিয়ে ইট ভাটার কাজে পাঠিয়েছে। যাদের মধ্যে আবু বক্কার ও ওমর ফারুকসহ ছয় জনের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য নিবন্ধন করা হয়েছিল। অভিন্ন দাবি জয়নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল ইসলামের। একই চিত্র শ্যামনগর উপজেলার নুতনঘেরী, ভেটখালী, ঈশ্বরীপুর, শ্রীফলকাঠি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের।

ঠাকুরঘেরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণপদ মন্ডল ও ভেটখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা প্রভাবতী মন্ডল জানান, তারা বাধা দেয়ার চেষ্টা করায় অভিভাবকরা শিশুদের লুকিয়ে কাজে পাঠিয়েছেন।

প্রধান শিক্ষক প্রভাতী মন্ডল অভিযোগ করেন, উদয়, রাশিদুল  কিংবা আরিফুলসহ কয়েকটি শিশু শ্রমিকবাহী বাসে অঝোরে কাঁদছিল না যাওয়ার জন্য। কিন্তু পিতা-মাতা আর শ্রমিক সর্দারদের চাপের মুখে তার কোনো আপত্তি কাজে আসেনি।

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সুলতান শাহাজান ও আক্তার হোসেন জানান, গত ৭ ও ৮ অক্টোবর সহকারী কমিশনার (ভূমি) আহসান উল্লাহ শরিফী ও পুলিশ পৃথক কয়েকটি অভিযান চালিয়ে শ্রমিকদের বহনকারী বাস থেকে নুরনগর, শ্রীফলকাঠি ও আটুলিয়া এলাকার ৩০ জন শিশুকে উদ্ধার করে। তবে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে শ্রমিক সর্দাররা শিশুদের ইট ভাটার কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

এ বিষয়ে শ্যামনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান জানান, উপ-পরিদর্শক আরিফুর রহমানের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে কয়েকটি অভিযানে বেশ কয়েকজনকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে লুকিয়ে একই শিশুদের আবারো কাজে পাঠানোর বিষয়ে তাদের কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।

শ্যামনগর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন জানান, লিখিতভাবে তিনি কোনো শিক্ষকের নিকট থেকে এমন অভিযোগ না পেলেও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। যার অংশ হিসেবে ঢাকাগামী বিভিন্ন পরিবহনে মাঝে মধ্যে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

তবে আর্থিক অনটনের কারণে অনেক পরিবার লুকিয়ে শিশু সন্তানদের এমন কাজে পাঠাচ্ছে দাবি করে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, এ প্রবণতা বন্ধে মা ও অভিভাবক সমাবেশ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিষয়টি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ফাহিমুল হক কিসলু বলেন, এমন চিত্র শুধু শ্যামনগর নয় জেলার সাতটি উপজেলার চিত্র একই। এজন্য প্রশাসনিক নজরদারি ও অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি।

আকরামুল ইসলাম/এআরএ/এমএস