ভাসমান বেডে সবজি চাষ এখন চাঁদপুরের মডেল
কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বেডে বিষমুক্ত সবজি চাষ এখন চাঁদপুর জেলার মডেল হিসেবে স্বীকৃত। এ পদ্ধতিতে সবজি আবাদ করে একদিকে যেমন লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা, অন্যদিকে বিষমুক্ত সবজি পাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
৩০ বছর আগে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান গ্রামের সহিদ তালুকদার (৪৫) এ পদ্ধতিতে প্রথম সবজি চাষ শুরু করলেও এখন গ্রামের শত শত কৃষক তা করছেন।
চাঁদপুর জেলা ছাড়াও আশপাশের অনেক জেলা থেকেও কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণার্থী এবং চাষিরা তার ভাসমান সবজি চাষ বিভিন্ন সময় পরিদর্শন করছে।
জানা গেছে, শোভান গ্রামের সহিদ তালুকদার ৩০ বছর পূর্বে বরিশাল থেকে নিয়ে আসা জনৈক চারা বিক্রেতার হাতে ভাসমান বেডে তৈরি একটি চারা দেখে আগ্রহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ওই চারা বিক্রেতার একটি চারা দেখতে গিয়ে তিনি তা নষ্ট করে ফেলেন। ফলে তাকে অর্থদণ্ড দিতে হয়। এ কারণে তার ভেতর জেদ চাপে নিজের এলাকাতেই তিনি ভাসমান বেড তৈরি করে তাতে সবজির আবাদ করবেন।
বরিশাল থেকে এই বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে শোভান গ্রামের পাশের ডাকাতিয়া নদীর তীরে ভাসমান বেড তৈরি করেন।
কচুরিপানা দিয়ে তৈরি এসব বেডের সবজি চাষের পাশাপাশি কচুরিপানার অংশ পরবর্তীতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ফলে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে এই সারের জনপ্রিয়তারও বেড়েছে অনেক।
সহিদ তালুকদার জানান, ভাসমান বেডে লাউ, কুমড়া, লালশাকসহ ১৫/১৬ জাতের সবজি চাষ করা সম্ভব। বছরের এপ্রিল মাস থেকে শুরু হয় এই বেড তৈরি যা শেষ হয় জানুয়ারি মাসে। তার এই সাফল্যে আগ্রহী হয়ে উঠে আশেপাশের চাষিরা।
সহিদ তালুকদার বলেন, আমি এ বছর ৫০টি ভাসমান বেড তৈরি করেছি। আমার খরচ পড়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। এ থেকে আমি প্রায় ৬ লাখ টাকা আয় করতে পারব বলে আশা করছি। ভাসমান সবজি চাষ আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়েছে। আমরা কৃষি বিভাগের পরামর্শে সার ও কিটনাশকের ব্যবহার ছাড়াই আধুনিক পদ্ধতিতে ধাপে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন করছি। বাজারে এ সবজির চাহিদা ও দাম বেশি। বেশি দামে সবজি বিক্রি করে আমরা লাভবান হচ্ছি।
তিনি জানান, গত ত্রিশ বছর ধরে ভাসমান বেডে সবজি চাষ করে তিনি সাবলম্বী হয়েছেন। এখান থেকে পাওয়া আয় দিয়েই ২ ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াচ্ছেন। এক ছেলে অনার্স, এক ছেলে এইচএসসি এবং একমাত্র মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী।
তিনি জানান, কচুরিপানা ফেলনা নয়, তা তিনি সকলকে দেখিয়েছেন। ফলে প্রতিনিয়ত এর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
শোভান গ্রামে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত কৃষক ভাসমান বেডে সবজি আবাদে নিয়োজিত।
ওই গ্রামের কৃষক বাবুল হোসেন বলেন, গত ২৫ বছর থেকেই কচুরিপানাকে কাজে লাগিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে ফসল আবাদ করছেন।
কৃষক ইব্রাহিম তালুকদার বলেন, এক শতাংশ পরিমাণ ধাপ তৈরি করতে আমাদের প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। আর আয় হয় প্রায় ৮০০০ টাকা। খরচ বাদে প্রতি শতক বেডে থেকে লাভ থাকে ৪ হাজার টাকা। ভাসমান বেডে সবজি উৎপাদন শেষে ওই বেডকে ভেঙে জমিতে ছড়িয়ে দিয়ে আমরা জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করি। শীত মৌসুমে বেডের বদৌলতে চাষে ও রাসায়নিকমুক্ত সবজি উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছি।
এ ব্যাপারে ফরিদগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার আহছান হাবিব বলেন, প্রতি বছরই ফরিদগঞ্জ ভাসমান ধাপে সবজি ও মসলা আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশপাশের অন্য উপজেলায় বীজতলা, সবজির চারা উৎপাদন অন্য কাজে কচুরিপানার বেড ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভাসমান চাষাবাদ পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে। শীতের সবজি উৎপাদনের সময় জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়িয়ে সবজি ও মসলার উৎপাদন প্রায় ৫ থেকে ৬ গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ পদ্ধতির আবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে।
এমএএস/আরআইপি