ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রাঙামাটির বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল

প্রকাশিত: ০৯:১৯ এএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৬

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রাঙামাটির বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। অনেক আগেই ধংস হয়ে গেছে প্রায় ছয় লাখ একরের সরকারি সংরক্ষিত বন। এককালের সেই জৌলুস বনাঞ্চল এখন বিরাণভূমি। ফলে বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ভারসাম্য হারাতে বসেছে পরিবেশ।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, অবাধে গাছ কেটে নিধন ও পাচার করায় পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি সার্কেলের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল অনেক আগেই উজাড় হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, বন বিভাগের এই সার্কেলে এরমধ্যেই প্রায় ছয় লাখ একরের অধিক সরকারি সংরক্ষিত বন ধ্বংস হয়ে গেছে। অবশিষ্ট বন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল পরিণত হয়েছে বিরাণভূমিতে। ফলে খাদ্য ও আবাসস্থল সংকটে পার্বত্যাঞ্চলে বিপন্ন জীববৈচিত্র্য। এছাড়াও নজরদারি না থাকায় এক ধরনের শিকারীদের অবাধ শিকারে দিনের পর দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। ফলে পার্বত্যাঞ্চল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে।

অন্যদিকে এ পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চল থেকে পাচার হয়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকার মূল্যবান কাঠ। নিধন করে পাচার করা হয় বাঁশ, বেতসহ মূলবান বনজসম্পদ। এজন্য ন্যাড়া হয়ে গেছে পাহাড়। পরিবেশ হারিয়ে ফেলছে ভারসাম্য। ফলে পার্বত্যাঞ্চলে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ এখন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে। যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন বিশ্লেষকরা।

পার্বত্যাঞ্চলে প্রাকৃতিক বন ছাড়াও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছিল সরকারি বন বাগান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল। কিন্তু বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী, কাঠ ব্যবসায়ী ও কাঠ চোর মিলে সমৃদ্ধ বনজ সম্পদ সাবাড় করে ফেলে। বর্তমানে টিকে রয়েছে শুধু কাপ্তাইয়ের জাতীয় উদ্যান। কর্ণফুলী নদীর কোল ঘেঁষে প্রায় ১৩ হাজার একর বিস্তৃত জায়গায় এ জাতীয় উদ্যানটির সৃষ্টি। এটি ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় বনভূমি নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধু রাঙামাটি জেলায় প্রায় ছয় লাখ একরের অধিক সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংস করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবৎ অবাধ নিধন ও পাচারের ফলে রাঙামাটি জেলার তিন লাখ ৯৩ হাজার ৮৪০ একর কাঁচালং সংরক্ষিত বন, ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৩৭ একর রাইংখিয়ং সংরক্ষিত বন এবং ৫৮২ দশমিক ৪০ একর বরকল সংরক্ষিত বন ধংস হয়ে গেছে। সেইসব বনাঞ্চল বৃক্ষশূন্য হয়ে বর্তমানে বিরাণভূমি।

সরকারি তথ্য সূত্রে মতে, ১৮৭১ সালে তৎকালীন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার ৬ হাজার ৮৮২ বর্গমাইল ভূমির মধ্যে পাঁচ হাজার ৬৭০ বর্গমাইল ভূমিই সরকারি বন ঘোষিত হয়। তার মধ্যে কাঁচালং সংরক্ষিত বন, রাইংখিয়ং সংরক্ষিত বন এবং বরকল সংরক্ষিত বন অনেক আগে ধংস হয়। ১৯০৯ সালে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে পৃথক হয়ে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বন বিভাগ। নিয়ন্ত্রণে আসে কাচালং, রাইংখিয়ং, সীতাপাহাড়, মাতামূহুরী ও সাংগু ব্লকের আরও এক হাজার ৬৫ বর্গমাইলের সংরক্ষিত বন এলাকা। এছাড়া শ্রেণিভুক্ত নয় এমন চার হাজার ৩০ বর্গমাইলের বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে, ১৯৯০ সালে সরকারিভাবে বনের গাছ বর্তন বন্ধ ঘোষণা করা হলেও বন রক্ষা ও বনায়নে আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে দিনের পর দিন অবাধে চলতে থাকে পার্বত্য এলাকার বৃক্ষ নিধন ও বনজ সম্পদ পাচার। এতে পার্বত্যাঞ্চলের বনভূমি ধংসের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছায়।

Rangamati

সম্প্রতি রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুচ আলী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন ধংস হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বন ছিল আজ তা নেই। দিনদিন উজাড় ও অবক্ষয়ের দিকে চলে যাচ্ছে সেখানকার বনভূমি। কাচালং, মাইনী, বরকল, সুবলং, রাইংখিয়ং, মাতামুহুরী, সাংগুসহ পার্বত্য অঞ্চলের সরকারি সংরক্ষিত বনগুলো নানাভাবে ধংস হয়ে গেছে। বন ধংস হওয়ায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি বলেন, জীববৈচিত্র রক্ষায় এবং মানুষের জীবিকার প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামে বন সংরক্ষণ, বনায়ন ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।

চাকমা সার্কেল চিফ রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ত ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে সুষ্ঠু বন ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। এজন্য তাদের সঙ্গে বন বিভাগকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বন, বনায়ন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদ্যামান বন আইনে অনেক জটিলতা রয়েছে। সংশোধন করে সেসব জটিলতা দূর করতে হবে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষ কেতু চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বাধিক বন ধংসের কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। তৎকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পার্বত্য অঞ্চলে অবাধে বন ধংস হয়েছে। ওই সময়ে স্থানীয় পাহাড়ি জনগণ বন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে জুমচাষ শুরু করে। পাশাপাশি বাইরের অনেক লোককে বন এলাকায় পুনর্বাসন করা হয়েছে। ফলে এখানকার বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন বিভাগের রাঙামাটি সার্কেলের বন সংরক্ষক মো. শামসুল আজম বলেন, জলাবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বনজ সম্পদের সুরক্ষা, সর্বোত্তম ব্যবহার সুনিশ্চিত, বনের আচ্ছাদন বৃদ্ধি এবং বন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সরকারি বন ও বন বহির্ভূত বৃক্ষ (গ্রামীণ বন) জরিপ করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি বছর নভেম্বর শুরু হওয়া এ জরিপ কার্যক্রম কাজ চলবে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত।

তিনি জানান, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও, ইউএসএআইডি এবং সিলভাকার্বন এর সহায়তায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এ জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বন ও গ্রামীণ বন এলাকার বনজ সম্পদ, বনের পরিমাণ, বনের আচ্ছাদন, গাছের প্রজাতি, কাঠ ও জ্বালানি কাঠের পরিমাণ এবং বন হতে পাওয়া সুবিধাদি নিরূপণের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী এই বৃক্ষ ও বন জরিপ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া এই জরিপ দেশের সরকারি বন ও গ্রামীণ বনের উন্নয়ন, ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ উদ্যোগকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কী ব্যবস্থা নেয়া দরকার, তার নির্দেশনা নির্ধারণ করা হবে।

শামসুল আজম বলেন, জরিপের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রিত জায়গায় সামাজিক বনায়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এসব সামাজিক বনায়নে স্থানীয় অধিবাসীদেরকে সম্পৃক্ত করেই তা বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য ৪০০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন আছে।  

আরএআর/আরআইপি