ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

৪৫ বছর ধরে আঘাত পাতি পাতি জীবন শ্যাষ

প্রকাশিত: ০৪:৩৪ এএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৬

‘আমাক দেখলে লোকজন মুখ ঘুরাইয়া বলে, পাকিস্তানি মিলিটারি বেইজ্জতি করছে। দেখতে ইচ্ছা করতাছে না। ৪৫ বছর ধরে আঘাত পাতি পাতি, খাটতি খাটতি জীবন শ্যাষ হইয়া গেলগা! দেখার কেউ নাই!’ একাত্তরে যুদ্ধের ঝড়ে বিপন্ন নারী সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া গ্রামের নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত পাওয়া রাহেলা বেগম এভাবেই তার বঞ্চনার কথা বললেন।

তবে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর লাঞ্ছনা আর অপমান নিয়ে বেঁচে আছি। মানুষ আমাকে ঘেন্না করলেও সরকার আমাকে দেশের জাতীয় বীর (মুক্তিযোদ্ধা) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এজন্য নিজেকে গর্বিত মনে করি।

রাহেলা জানান, বিয়ের মাত্র দেড় বছর পর শুরু হয় একাত্তরের যুদ্ধ। তখন আমার বয়স ২২ বছর। এক সকালে বাবা এসে বললেন, চল পালাই। বাবা আমাদের নিয়ে এলেন রায়গঞ্জ উপজেলার ঘুড়কা গ্রামে।

সেখানেই তার জীবনে নেমে আসে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর নির্যাতন। ওই বাড়িতে তারা ছাড়াও আরো তিন নারী একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। ঘরে ঢুকে পড়ে হানাদাররা। তাদের ওপর চালায় অকথ্য নির্যাতন এবং স্বামীর সামনেই রাহেলার ওপর চলে এ নির্যাতন। এ ঘটনার পর রাহেলার স্বামী মোহাম্মদ আকবর হোসেন পালিয়ে যান।

পরে গভীর রাতে তার বাবা এসে উদ্ধার করে তাকে ফুফুর বাড়ি নিয়ে যান। সেখানে ২০ দিন থাকার পর বাড়ি ফিরে আসেন। সেই থেকে দীর্ঘদিন দেখা নেই স্বামীর সঙ্গে। শুরু হয় রাহেলার অন্যরকম যুদ্ধ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার এক মাস পর বাড়ি ফিরে এলে স্বামী আকবর আলী তাকে মেনে নেননি। আশ্রয় নেন বঙ্গবন্ধুর নারী পুনর্বাসন কেন্দ্রে। বঙ্গবন্ধু মারা যাওয়ার পরদিন পুনর্বাসন কেন্দ্রের কেয়াটেকার বললেন, তাড়াতাড়ি পালাও তোমরা। নইলে তোমাদেরও মেরে ফেলবে। তখন যে যার ঠিকানায় চলে গেল। রাহেলাও বাপের বাড়ি এসে আশ্রয় নিলেন। দেড় বছর পর রাহেলা শ্বশুরপক্ষ, বাপের বাড়ির লোকজন এবং স্থানীয় মাতবরের সহায়তায় স্বামীর ঘরে ফিরে যান।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাহেলা বেগম জানান, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি। তবে সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধা এখনও পায়নি। সন্তানদের জন্য একটু জায়গা ও একটি ঘরের ব্যবস্থা করে দেয়ার দাবি জানান তিনি।

রাহেলার দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। তাদের মধ্যে এক ছেলে বাসের হেলপার। আরেক ছেলে পড়ালেখা করেছে। কিন্তু বীরাঙ্গনা মায়ের ছেলে হওয়ায় কোথাও চাকরি হয়নি তার।
 
এমনকি ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এর আন্দোলন শুরু হলে রাহেলা বেগমকে আনা হয়েছিল সেখানে। গণজাগরণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের সামনে বক্তব্যও দিয়েছিলেন এই বীরাঙ্গনা। বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলেও তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল। গণমাধ্যমে তার ওপর একাত্তরের নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে বলার কারণে ঘটে যায় আরেক বিপর্যয়।

গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য দেয়ার পর রাহেলার মেয়ে চম্পাকে তার স্বামী মিলন এক মেয়েসহ তালাক দেন। চম্পা এখন বীরাঙ্গনা মায়ের অভাবের সংসারে এসে উঠেছেন। তালাকপ্রাপ্ত মেয়েকে নিয়ে রাস্তার ধারে পিঠা বিক্রি এবং সুতাকলে কাজ করে সংসার চলছে তার।

রাহেলা থাকেন সিরাজগঞ্জের সয়াধানগড়া বাসস্ট্যান্ডের পাশে পুকুরপারের বস্তিতে। এ বস্তির জায়গা সরকার অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণের চিঠিও জেলা প্রশাসন থেকে দেয়া হয়েছে বস্তিবাসীকে। যেকোনো সময় উচ্ছেদ হতে পারেন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রাহেলা।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর অপেক্ষার পর চলতি বছরে সিরাজগঞ্জে বেঁচে থাকা প্রথমে ১৩ জনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তারা সরকারের সকল সুবিধা ভোগ করবেন। পরবর্তীতে বাকি ৫ বীরাঙ্গনাকেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তারাও মুক্তিযোদ্ধার সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন বলে জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার গাজী আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী জগলু।

ইউসুফ দেওয়ান রাজু/এফএ/এমএস