ধরাকে সরা করে চলেছেন মান্দা আ.লীগ সভাপতি
নওগাঁর মান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমদাদুল হক মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি পদ নিয়ে তিনি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলেছেন। কোট কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। শুধু তিনিই নয়। বাবার পদের ক্ষমতার বলে ছেলে মহিদুল হক বাদশা ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করেছেন।
জোরপূর্বক বালুমহাল দখল, চাঁদা আদায়, ভূমি দখলসহ রয়েছে বিভিন্ন অভিযোগ। এলাকায় তাদের ভয়ে কেউ কিছু বলার সাহস পায়না। এখন মোল্লা বংশের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে চায় মান্দাবাসী। তার পরিবারের সব অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্মের বিচারের দাবিতে দিনে দিনে ফুঁসে উঠেছে তারা। আগামীতে যেন এমদাদুল হক মোল্লা আওয়ামী লীগের কোনো পদে থাকতে না পারে এ নিয়ে উপর মহলের সুদৃষ্টিও কামনা করেছেন মান্দাবাসী।
জানা গেছে, স্বাধীনতার সময় ন্যাপ এবং জিয়াউর রহমানের সময় ইয়ত কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমদাদুল হক মোল্লা। নব্বইয়ের দশকে কুশুম্বা ইউনিয়নের খোদাবক্স নামে এক ব্যক্তিকে এমদাদুল হক মোল্লাসহ কয়েক জন ধরে নিয়ে এসে মারপিট করে হত্যা করে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার সময় হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাভোগও করেন। বেশ কয়েকবার জেল ভোগ করে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি।
এরপর তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বাবু বিমল কুমার রায়ের স্থলাভিসিক্ত হন। ২০০৫ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ লাভ করেন তিনি। এরপর পর থেকে মান্দায় দাপটের সঙ্গে চোষে বেড়ানো শুরু করেন। তার দাপটে উপজেলা আওয়ামী লীগ কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
কিন্তু গত ৮/৯ বছর থেকে তিনি একলা চল নীতি অবলম্বন করতে থাকেন। ক্ষমতার দাপটে ও বেপরোয়া চলাফেরায় ভয়ে এলাকায় কেউ কিছু বলার সাহস পায় না তার বিরুদ্ধে। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ায় ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা তার উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তিনি নানা পন্থায় অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়ে নামে বেনামে সম্পদ অর্জনসহ কোটিপতি বনে গেছেন।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহাম্মদ ইমাজ উদ্দিন প্রামাণিক মান্দার জন্য যতগুলো বরাদ্দ পেয়েছেন সবগুলো এমদাদুল হক মোল্লাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারি গুদামে ধান, চাল, গমসহ সবকিছু মোল্লা নিজে সরবরাহ করেন। পল্লী বিদ্যুতায়তনের সংযোগ দেয়ার নামে এলাকাবাসীর কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক টাকা নেয়া, এমনকি বিভিন্ন সরকারি পুকুর, দিঘী লিজ দেয়ার নামে উপজেলা থেকে এমদাদুল হক মোল্লা নিজ নামে নিয়ে নামমাত্র টাকা দিয়ে বেশি টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জনের মধ্যে বিতরণ করেন।
এমদাদুল হক মোল্লা নিজেই উপজেলার প্রসাদপুর বাজারে ধানহাটির ৮০৭ দাগের জমি দখল করে দোকান নির্মাণ করেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ টাকায় এলাকার ছোট বেলালদহস্থ গ্রামে ৪টি, প্রসাদপুর বাজারের গোল চত্বরে (নির্মাণাধীন) ১টি, উপজেলা চত্বরের প্রধান রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে ১টিসহ মোট ৮টি ২-৪ তলা বিশিষ্ট আলিশান সুদর্শন পাকা বাড়ি করেছেন। এছাড়া নোহা ও হাইচসহ ৪-৫টি গাড়ি রয়েছে।
এদিকে, বাবার সভাপতি পদে ক্ষমতার বলে ছেলে মহিদুল হক বাদশা ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। একটা প্রবাদ শোনা যায়- ‘আমি বাদশা, এই এলাকাই রাজত্ব করব আমি’। বাদশা তার রাজত্ব পরিচালনা করতে যা খুশি করে যাবে এলাকাবাসী তা দেখেও না দেখা এবং মুখ বন্ধ করে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর পূর্বক চাঁদা আদায়, সরকারি জায়গা দখল। মান্দার সম্পন্ন বালুমহল ভোগদখল করে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন বাদশা। একই এলাকার সাইফুল ইসলামের ইজারাকৃত বালু মহাল জোরপূর্বক দখল করার অভিযোগ আছে।
প্রসাদপুর বাজারে গত এক বছর আগে ‘ফয়সাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এর প্রধান গেট খুলে না দেয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ‘নাভানা’ মাইক্রো ভাঙচুর করে বাদশা। ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার বাবাকে ভাঙচুরের অভিযোগ করায় বাদশা বাহিনীর ৫-৭ জন লোক এসে পরিচালককে তার অফিসে উঠিয়ে নিয়ে যায়। যা স্থানীয়রা অবগত আছেন।
পরে অবশ্য পরিচালককেই বাদশার কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। ওই ক্লিনিক হওয়ার পর দুইবারে ১লাখ ১০ হাজার টাকার মতো চাঁদা নিয়েছে বাদশা।
কিছুদিন আগে বাদশা প্রসাদপুর বাজারের সন্তোষ ও পরিতোষের পরিবারের ৩ শতাংশ জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণ শুরু করলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে উদ্ধার হয় ওই পরিবার।
প্রসাদপুর তোহা বাজারে অনেক দোকানীকে উচ্ছেদ করে এমদাদুল হক মোল্লার ছেলে আবু রাশেদ মোল্লা ও জামাই নজরুল ইসলাম গণ-সৌচাগারের হাউসের উপরসহ আশপাশের সরকারি প্রায় ৫ শতাংশ জমি দখল করে ৭টি দোকানঘর নির্মাণ করেছে। প্রতিটি দোকানঘর ১-২ লাখ টাকা সিকিউরিটি দিয়ে এবং মাসে পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে দোকান করে আসছে অনেকে।
গত ১৭ ডিসেম্বর হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়ের মধ্যে বিয়েকে কেন্দ্র করে উপজেলার প্রসাদপুর বাজারে সন্ধ্যায় হঠাৎ করে মহিদুল হক বাদশা ও তার ক্যাডার বাহিনী উপজেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক অনুপ কুমার মোহন্ত ও তার ছোট ভাই যুবলীগ নেতা গৌতম কুমার মোহন্তের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে।
এছাড়া সন্ত্রাসীরা মোহন্ত অটোজে হামলা চালিয়ে ৩/৪টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেছে। তারা সংখ্যালঘুদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে টিভি মেকার সাধনকে বেদম মারপিট করে।
এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলায় মহিদুল হক বাদশা, সুমন কুমার ঘোষ, আশরাফুল ইসলাম, আব্দুল ওয়াহাব হিরা, সুবল কুমার পুটুর নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়।
২০ ডিসেম্বর মহিদুল হক বাদশাকে রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলা সদর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর থানার শিমুলদীয়া বাজার থেকে সুমন কুমার ঘোষ ও আশরাফুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তারা নওগাঁ জেল হাজতে আছেন।
এলাকাবাসী আসলাম হোসেন টিপু নামে একজন বলেন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভাট, পুলসহ যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর বেহাল অবস্থা। আর এ অবস্থার জন্য দায়ী বর্তমান থানা আওয়ামীলীগ ও যুবলীগ কমিটি। জনগণের মতে এটি হলো ব্যার্থ কমিটি। কমিটির ৯০ ভাগ নেতারা জনগণের মতে অযোগ্য। আর অযোগ্য নেতারা কী উন্নয়ন করবে। তারা সব সময় নিজের স্বার্থের কথা ভাবে। তারা কখনো জনতার কথা ভাবে না।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আব্দুল মান্নান বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সভাপতি তার ছেলে বাদশাকে দিয়ে দুর্নীতি লোটপাট, টেন্ডারবাজী, বালু মহল দখল, চাকরি, নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছে। সভাপতি হওয়ার আগে যে ওষুধ খাওয়ার টাকা পেত না এখন সে বাড়ি-গাড়িসহ অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক।
তিনি আরো বলেন, এমদাদুল হক মোল্লা কখনোই আওয়ামী লীগ করেনি। সে রাজাকার পরিবারের সন্তান। তার চাচা আব্বাস আলী মোল্লা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিল। তাকে মুক্তিযোদ্ধারা হত্যা করেছে।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল লতিফ শেখ বলেন, অন্যায়ভাবে এ সম্পদ অর্জনে তার ন্যায্য বিচার হওয়া উচিত। বর্তমান সরকারের দু’দফায় সে এ সম্পদ অর্জন করেছে। তার সঙ্গে সরাসরি বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী সম্পৃক্ত বলে তিনি দাবি করেন। শত বাধা বিপত্তি দিয়েও আমরা কিছু করতে পারিনি। কারণ উপরে তার অনেক বড় শক্তিশালী হাত রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে সভাপতি এমদাদুল হক মোল্লার মোবাইলে কয়েকদিন যাবৎ ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
আব্বাস আলী/এফএ/আরআইপি