ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

কান্না থামছে না বৃদ্ধ সেলিমের

প্রকাশিত: ১২:১৩ পিএম, ১৬ জানুয়ারি ২০১৭

সাড়ে ১২ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত বসতবাড়ি ঝিনাই নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। ভিটেবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন ষাটোর্ধ্ব সেলিম। ঝিনাই নদীতে বালু উত্তোলনের ফলে বৃদ্ধ সেলিমসহ অনেক স্থানীয় বাসিন্দার বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু কিছুতেই কান্না থামছে না বৃদ্ধ সেলিমের।  

তার বাড়ি ফতিপুর ইউনিয়নের বৈলানপুর গ্রামে। উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের হিলড়া এলাকায় ঝিনাই নদীর ১০০ গজের মধ্যে পাঁচটি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

অবৈধভাবে বালু উত্তেলনের ফলে সেলিমের বাড়িসহ ওই এলাকার কয়েকটি বাড়ি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া ঝিনাই নদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

অপরদিকে একই এলাকায় আনুমানিক পাঁচশ গজ দূরে ভেকু মেশিন দিয়ে নদীর পাড় থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে মাটি। বালু ও মাটি ট্রাকে করে সরবরাহ করা হচ্ছে। অপরিকলল্পিত বালু উত্তোলন ও নদীর তীর কাটার ফলে নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ধরেছে।

এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বালু তোলার কারণে কুর্ণী-ফতেপুর সড়ক রক্ষাকারী বাঁধের প্রায় ১৫০ ফুট জায়গা দেবে ও ভেঙে গেছে।

Mirzapur

গত শনিবার সরেজমিনে নদী থেকে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা গেছে। ফতেপুরের থলপাড়া ব্রিজ এলাকা থেকে ফতেপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় অন্তত আটটি খননযন্ত্রের সাহায্যে বালু উত্তোলন চলছে। পাশাপাশি থলপাড়া ও ফতেপুর গ্রামের অন্তত চারটি স্থানে যন্ত্রের (ভেকু) সাহায্যে নদীর পাড় কেটে মাটি নিতে দেখা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি এখন নদীর পাড় কেটে মাটি নেয়া হচ্ছে। দিনরাত চলছে বালু ও মাটি লুট। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন নীরব।

উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের থলপাড়া গ্রামের বৈলানপুর এলাকার আমিনুরের স্ত্রী গৃহবধূ কহিনুর বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ঝিনাই নদীকে স্থানীয় লোকজন বলেন ‘বউমরা’ নদী।

মাটি ব্যবসায়ী নাজমূল ইসলাম ও শহীদুর মৃধাকে বালু রাখার জন্য কহিনুর বেগম এক বছর আগে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় বাড়ির পাশের জমি ভাড়া দিয়েছিলেন। বালু ব্যবসায়ীরা খননযন্ত্র (ড্রেজার) দিয়ে তার বাড়ির পাশেই নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে তীর ভাঙা শুরু হয়। গত বর্ষা মৌসুমে তার পাকা ঘরসহ ২০০ শতাংশ জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। এখন বসতভিটাও চলে যাচ্ছে।

কহিনুরের প্রতিবেশী সেলিম খান কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার সাড়ে ১২ শতক ভিটেবাড়ি ছিল। সবই গেছে নদীগর্ভে। এখন অন্য একজনের জায়গায় খোলা আকাশের নিচে কোনো রকমে খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।

Mirzapur

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কাজে হিলড়া গ্রামের সমেজ উদ্দিনের ছেলে এছাক মিয়া, কাউছার খন্দকারের ছেলে নাদু খন্দকার, তোলা মিয়ার ছেলে প্রিন্স, লিটন, সাকনাইর চরের মিলন হোসেন, ফতেপুর শওকত হোসেন, নুরু মিয়া, তোফাজ্জল হোসেন, থলপাড়া গ্রামের রউফ মিয়ার ছেলে সজলসহ অনেকেই জড়িত।

গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গত বছর ওই এলাকায় ১০টি খননযন্ত্র দিয়ে নদী থেকে বালু তোলা হয়। এ বছরও বর্ষা মৌসুমে বালু তোলা শুরু হয়। এখনো চলছে। দিনরাত অন্তত ৫০টি ড্রাম ট্রাক বালু ও মাটি নিয়ে যাচ্ছে। প্রতি ট্রাক বালু কিংবা মাটি ৮০০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

গ্রামের বাসিন্দা হাসান মিয়া ও আওয়াল ফারুক বলেন, সেলিমের মতো আসহায় আর কেউ নাই। ওর ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ওকে যদি আল্লাহ না দেখে, তাহলে তাকে দেখার কেউ নেই। পাশের বাড়ির আমিনুরের বাড়িতে থাকার জন্য একটু জায়গা দেয়া হয়েছে। সেখানেই দিন কাটে তার।

বৈলানপুর এলাকায় পাঁচটি খননযন্ত্র দিয়ে নদী থেকে বালু তুলে বিক্রির জন্য নদীর পাশেই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। বালু তোলার কারণে কুর্ণী-ফতেপুর সড়ক রক্ষাকারী বাঁধের প্রায় ১৫০ ফুট জায়গা দেবে ও ভেঙে গেছে। বৈলানপুরের পাশে হিলরা বাজারও ভাঙনের মুখে। ইতোমধ্যে সাত-আটটি দোকান অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

থলপাড়া গ্রামের মধ্যপাড়া এলাকায় নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে ট্রাকে করে অন্যত্র সরবরাহ করা হচ্ছে। এ সময় থলপাড়া গ্রামের পাপন মিয়া বলেন, তাদের নিজস্ব সম্পত্তি নদী ভেঙে নিয়ে গেছে। এখান থেকে তারা বালু তুলে অন্যত্র বিক্রি করেন। তাছাড়া নদীতে খননযন্ত্র বসানোর কাজও করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

Mirzapur

ফতেপুর বাজারের পাশে গোড়াকী-ফতেপুর খাল থেকে তোফাজ্জল হোসেন ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রি করছেন। জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের জায়গাসহ খালের জায়গার কিছু অংশের মাটি কেটে বিক্রি করেছেন তারা।

বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নাদু মিয়া বলেন, এসব নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। কাজেই মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন তালুকদার বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলনে বাধা দিয়ে কোনো লাভ হয় না। অসহায়ের মতো শুধু বন্ধ করার কথাটাই বলতে পারি। কোন কাজে আসছে না। এদের শক্তি কোথায় জানি না।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত সাদমীন জানান, তিনি এখানে নতুন যোগ দিয়েছেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ইউনিয়ন সহকারি ভূমি অফিসারের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

এস এম এরশাদ/এএম/জেআইএম