পায়ে হেঁটে ৫২ জেলা ভ্রমণ করেছেন নাসিম
‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষৎ, আর নয় শিশু শ্রম, এবার চাই শিক্ষা’ স্লোগান নিয়ে দিনাজপুর জিরোপয়েন্ট থেকে হেঁটে দেশ ভ্রমণে বের হয়েছেন উদীয়মান তরুণ শিক্ষার্থী রোভার স্কাউট নাসিম তালুকদার। ইতোমধ্যে তিনি হেঁটে ৫১ জেলা ভ্রমণ করেছেন। ৫২তম জেলা ভ্রমণ হিসেবে বর্তমানে তিনি সিলেটে অবস্থান করছেন।
গত বছরের ২২ অক্টোবর শনিবার সকাল ৯টায় দিনাজপুর জিরোপয়েন্ট থেকে দেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন নাসিম তালুকদার।
প্রতিদিন গড়ে ৩৫-৪০ কি. মি. রাস্তা হাঁটেন তিনি। হেঁটে দিনাজপুর, বিরামপুর হয়ে ১৩০ দিনে দেশ ভ্রমণ করে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও হয়ে দিনাজপুরে এসে সমাপ্ত হবে তার এ ভ্রমণ।
দিনাজপুর কেবিএম কলেজ থেকে সদ্য এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী মো. নাসিম তালুকদার এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বড়। মা নাসিমা খানম বাকপ্রতিবন্ধী। পেশায় গৃহিণী। বাবা হারুনুর রশিদ বাচ্চু পেশায় কৃষক।
ছোটবেলা থেকে নাসিম তালুকদারকে লালন-পালন করেছেন তার নানি দিনাজপুর উপশহর ৫ নং ব্লকের বাসিন্দা রহমত আরা।
এ বিষয়ে নাসিম তালুকদার বলেন, ২০০৬ সালের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭৪ লাখ শিশু শিশু শ্রমবাজারের বিভিন্ন কর্মস্থলে নিয়োজিত। এদের মধ্যে ১৩ লাখ শিশু অধিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে বেসরকারি পরিসংখ্যানের হিসাবে দেখা গেছে, দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা রয়েছে ৭০ লাখ। আর ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমিকের কাজ করছে ১৫ লাখ। সরকারের নিয়ম অনুযায়ী ১৪ বছরের নিচের শিশুরা কেউ কোনো ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না। অথচ এটি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।
তিনি বলেন, শিক্ষা ও খেলাধুলা থেকে দূরে রয়েছে এমন শিশুদের সংখ্যা দিনাজপুরেও কম নয়। মিল, ইন্ডাস্ট্রিজ, কলকারখানার বিভিন্ন কাজে শিশুরা হাড়ভাঙা শ্রম দিচ্ছে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কথা তুলে ধরেন তিনি।
মো. নাসিম জানান, শিশুরা যাতে তাদের অধিকার নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে সেদিকে সবার সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে হেঁটে দেশ ভ্রমণে বের হয়েছেন তিনি।
হেঁটে ১৩০ দিনের দেশ ভ্রমণে প্রশাসন, ব্যবসায়ী, সমাজ সচেতন মানুষ, শিল্পপতি, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলছেন তিনি।
ভ্রমণ শেষে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আনুষ্ঠানিকভাবে তা মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে তুলে ধরার ইচ্ছা পোষণ করেন নাসিম তালুকদার।
তিনি জানান, তার সঙ্গে দেশের আরও ৪টি জেলার মোট ৮ জন সফরসঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। এর মধ্যে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার আতিকুজ্জামান ও তৌহিদুর রহমান, পাবনা, রাজশাহী ও ঢাকা থেকে আরও ৬ জন সঙ্গী হতে চেয়ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কেউ যুক্ত হননি। 
নাসিম তালুকদারের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দেশ ভ্রমণের অংশ হিসেবে আমি ৫২তম জেলায় অবস্থান করছি। এখন আমি সিলেটে রয়েছি। ইতোমধ্যে ৫১টি জেলা ভ্রমণ শেষ হয়েছে। এরপর সুনাগঞ্জ হয়ে ময়মনসিংহ যাব। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আমার সফর শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হেঁটে চলতে গিয়ে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার লোহাগড়া উপজেলায় যাওয়ার পথে তাকে ছিনতাই কারিদের কবলে পড়তে হয়। সেখান থেকে দৌঁড়ে পালিয়ে রক্ষা হয়।
এছাড়া বান্দরবন, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি জেলাগুলো ভ্রমণের সময় পাহাড়গুলোতে উঠতে আমাকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। বাংলাদেশ রোভার স্কাউট অঞ্চলের সম্পাদক এ কে এম সেলিম চৌধুরী ও যুগ্ম সম্পাদক সোহেল আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
নাসিম তালুকদার জানান, চট্টগ্রামে গিয়ে তার যাত্রা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে থমকে যায়। সে সময় ‘চলবে ডটকম’ তার পাশে দাঁড়ায়। তারা স্পন্সর করে। ফলে তার যাত্রা আর ব্যাহত হয়নি।
নাসিম তালুকদার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আগামী ২৫ থেকে ৩১ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় রোভার মুট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গীপাড়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে আমাকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আমাকে সেখানে স্বেচ্চাসেবক হিসেবে নেয়া হয়নি।
এমদাদুল হক মিলন/এএম/এমএস