‘নুরুল হুদার জনতার মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই’
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সার্চ কমিটির দেয়া তালিকা থেকে সাবেক সচিব কে এম নুরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে মঙ্গলবার রাতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
আপসহীন ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষ হিসেবে পরিচিত কে এম নুরুল হুদাকে সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগ দেয়ার পর থেকেই সারাদেশে তাকে নিয়ে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। বিভিন্ন সময় সরকারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বে থাকা নতুন এই নির্বাচন কমিশনারের বর্ণাঢ্য জীবনের কথা বলেছেন তার পরিবারের লোকজন।
জানা গেছে, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নওমালা ইউনিয়নে ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন কে এম নুরুল হুদা। ১১ ভাই বোনের মধ্যে নুরুল হুদা তৃতীয়। শিক্ষক বাবার সরাসরি তত্ত্বাবধানে ১১৩নং পশ্চিম নওমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন তিনি। এরপর বগা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা ও পটুয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন নতুন এ সিইসি। ১৯৭২-৭৩ সালে হল ছাত্র সংসদে সাংস্কৃতিক সম্পাদকও ছিলেন নুরুল হুদা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ১৯৭১ সালে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাড়ি দেন তিনি। প্রশিক্ষণ শেষে অক্টোবর মাসে সুন্দরবন ও বাগেরহাটের শরণখোলা হয়ে পটুয়াখালী এসে ৯নং সেক্টরের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ওই সময় গলাচিপার পানপট্টিতে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা। সেখানে বিরতিহীন ১৩ ঘণ্টা যুদ্ধ করে সহস্রাধিক পাকসেনাকে হটিয়ে মুক্ত করা হয় পানপট্টি এলাকা। যুদ্ধক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি সফল অপারেশনের পর তাকে পটুয়াখালীর একাংশের প্রশাসনিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়।
কে এম নুরুল হুদার ছোট ভাই কে এম নাসির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন নুরুল হুদা। স্ত্রী হুসনে আরার সঙ্গে নুরুল হুদার সংসারে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে প্রকৌশলী। তিনি কানাডায় থাকেন। মেজ মেয়ে বুয়েট থেকে পাস করে পিএইচডি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে থাকেন। ছোট মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য কানাডায় আছেন। এদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি পদে নিজের দক্ষতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সমালোচনার বাইরে থাকতে পারবেন বলে মনে করেন সিইসির পরিবারের সদস্যরা।
কে এম নুরুল হুদার বড় ভাই আবু তাহের খান জাগো নিউজকে বলেন, বিসিএসে ১৯৭৩ সালের একজন সদস্য হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন কে এম নুরুল হুদা। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরুর পর কুমিল্লা ও ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এছাড়া ঢাকা সিটি করর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সংসদ সচিবালয় যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
২০০৬ সালে বাংলাদেশ সরকারের সচিব হিসেবে চাকরি থেকে অবসরে যান। ২০১০ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ মিউনিসিপাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে (বিএমডিএফ)। সেখানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে ছিলেন পাঁচ বছর। এর আগে জেমকন গ্রুপের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ), নর্থ ওয়েস্ট জোন কোম্পানির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
বিএনপির তরফ থেকে জনতার মঞ্চের সঙ্গে কে এম নুরুল হুদার সম্পৃক্ততার যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছে তার পরিবার। অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন এ নিয়ে মামলা করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। হাইকোর্টে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি সেই সময়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবদুল হালিম বলেন, কে এম নুরুল হুদা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হওয়ায় জেলার মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দিত। তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য। ঠিক সেভাবেই আন্তরিকতার সঙ্গে দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে সিইসির দায়িত্ব পালন করবেন।
এমএএস/আরআইপি