লোডশেডিংয়ে নষ্ট হচ্ছে বোরো ফসল
চাহিদার অনুপাতে সরবরাহ অনেক কম থাকায় জেলার গ্রামগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের মারাত্মক লোডশেডিং চলছে। এ কারণে চলতি মৌসুমের ইরি-বোরো আবাদ ব্যহত হচ্ছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারায় শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে অনেক কৃষকের জমি।
নেত্রকোনা সদরসহ বারহাট্টা, আটপাড়া, কলমাকান্দা, মদন ও দুর্গাপুরের বিভিন্ন এলাকায় সেচের অভাবে হুমকিতে পড়েছে চলতি বোরো ফসল।
স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্র জানিয়েছে, জেলার ১০ উপজেলায় বিদ্যুতের দৈনন্দিন চাহিদা ৫২ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে সর্বনিম্ন ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত। সরবরাহে ঘাটতির কারণে কৃষি নির্ভর এ জেলায় অনেক সময় এক তৃতীয়াংশ চাহিদাও পূরণ হচ্ছে না। দিন-রাত সবসময়ই লোডশেডিং হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, সারা জেলায় পল্লী বিদ্যুতের আওতায় সাড়ে ৮ হাজার সেচযন্ত্র রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে কোনোটিই নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারছে না। কোনোটি রাতে দু-চার ঘণ্টা চললেও দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। জমিতে পানি সেচ দেয়ার জন্য কৃষকদের রীতিমতো লাইন ধরতে হচ্ছে। আবার সময়মতো সেচ দিতে না পারায় অনেকের জমি শুকিয়ে চৌচিরও হয়ে যাচ্ছে।
নেত্রকোনা সদর উপজেলার সিংহেরবাংলা এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বাদল মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, সেচের অভাবে আমার প্রায় ছয় একর জমির পুরোটাই শুকিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে সেচযন্ত্রের মাধ্যমে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে এলাকায় বিকল্প পানির কোনো উৎসও নেই।
তিনি জানান, তার মতো এলাকার আরও বহু কৃষক সেচ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সেচের অভাবে কেউ কেউ জমিতে সারও দিতে পারছেন না।
কেন্দুয়া উপজেলার আশুজিয়া গ্রামের সোহাগ মিয়া জাগো নিউজকে জানান, দিন-রাত সব সময়ই লোডশেডিং হচ্ছে। সারাদিনে দু-তিন ঘণ্টাও বিদ্যুতের দেখা মিলছে না। এ ব্যাপারে পল্লী বিদ্যুতের স্থানীয় কর্মচারীরা কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না। এছাড়া সেচের চাহিদা মেটাতে না পারায় সেচ যন্ত্রের মালিকরাও চরম বেকায়দায় আছেন। চরম লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারাও।
বারহাট্টার রায়পুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান রাজু জাগো নিউজকে জানান, এলাকার অনেক জমি নষ্ট হওয়ার পথে। এলাকার কৃষকরা এখন বোরো জমিতে সেচ দিতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
এদিকে কলমাকান্দা উপজেলার সিধলী এলাকার বিষমপুর গ্রামের আব্দুল কুদ্দুছ জাগো নিউজকে জানান, ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলে কিছু জমি রক্ষা করা যাবে।
দুর্গাপুর উপজেলার বালিচান্দা গ্রামের সজিম সাইন জাগো নিউজকে জানান, কয়েকবার স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সুফল মেলেনি। অনেকেরই বছরের একমাত্র ফসল নষ্ট হয়ে এখন দিশেহারা প্রায়।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জিএম মো. মজিবুর রহমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের কথা স্বীকার করে জাগো নিউজকে জানান, এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ও জামালপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে। কিন্তু কেন্দ্র দু’টির জ্বালানি হিসেবে পর্যাপ্ত গ্যাস ও ফার্নেস ওয়েল সরবরাহে ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। আর এ কারণেই চাহিদামত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বিষয়টির দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে।
বর্তমান সরকার সারাদেশে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সেবা এবং গ্রাহক চাহিদার এক দিনের মধ্যেই সংযোগ সার্ভিস দিতে বদ্ধপরিকর থাকলেও মদনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পৌরসদরে বিদ্যুৎ পাচ্ছে মাত্র ৮ ঘণ্টা। পল্লী এলাকার অবস্থা আরো নাজুক। বিদ্যুতের সাহায্যে বোরো ধান আবাদ করে কৃষক পড়েছে বিপাকে। পানির অভাবে জমি ফেটে চৌচির হয়ে ধান গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করছে।
উপজেলার কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, পৌরসদরসহ উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের চলতি বোরো মৌসুমে বিদ্যুতের সাহায্যে ১ হাজার ৭শ ৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার কৃষকের বোরো আবাদের জন্য রাত ১১টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্যুৎ সরবারাহ করার ঘোষণা দেয়।
কিন্তু বাস্তবে ২-৩ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। এই ভয়াবহ লোডশেডিং এর কবলে পড়ে কৃষি ক্ষেত্রে যেমন অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে তেমনি ভাবে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, ফ্রিজে রাখা বিভিন্ন মালামাল নষ্ট ও বিভিন্ন কাজকর্মে লোকজন হতাশা ও ক্ষুব্দ হয়ে উঠছে।
কামাল হোসাইন/এফএ/আরআইপি