ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

কৃষি জমিতে ইটভাটা, চলছে শিশুশ্রম

প্রকাশিত: ০৬:২২ এএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

শরীয়তপুর নড়িয়া উপজেলার নশাসন ইউনিয়নের ডগ্রী শাওড়া গ্রামে আইন লঙ্ঘন করে ফসলি জমিতে একটি ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। ইটভাটাটিতে শুরু থেকে চলছে শিশুশ্রম। নির্মাণাধীন ওই ভাটার পাশে রয়েছে গ্রামীণ সড়ক, বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বসতভিটা, রয়েছে বিভিন্ন কাঠ ও ফলের গাছ।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ কিলোমিটার, বনাঞ্চল থেকে ২ কিলোমিটার এবং ইউনিয়ন বা গ্রামীণ সড়ক থেকে অন্তত আধা কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। তাছাড়া ইটভাটার চুল্লির একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা বাধ্যতামূলক।

কিন্তু এ আইন লঙ্ঘন করে উপজেলার ডগ্রী শাওড়া গ্রামের খোকন তালুকদার ও নুরুল আমীন হাওলাদার ন্যাশনাল ব্রিক ফিল্ড (এনবিএম) নামের একটি ইটভাটা গড়ে তুলেছেন।

Shariatpur-Iter-Vata

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সূর্যের আলো ফোটেনি। কিন্তু ততক্ষণে ৮ বছর বয়সী সোলায়মান, ৭ বছর বয়সী মিনা আক্তার, সুরমা আক্তার ৯ বছর বয়সী ও রবিন (৮) কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে এসে কাজ করছেন এনবিএম ইটের ভাটায়। প্রতিটি শিশু রোজ ৫০০ ইট টানে। ৫০০ ইটের বিনিময়ে একজন শিশু পায় ৫০ টাকা। তাদের মতো প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ১৫ জন শিশু এনবিএম ইটভাটায় কাজ করছে। অথচ আইন বলছে ১২ বছরের নিচের কোনো শিশুকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না।

সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীন ওই ইটভাটা ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। প্রায় ২৫ বিঘা কৃষিজমিতে ইটভাটাটি গড়ে তোলা হয়েছে। ভাটার ১০০-১৫০ গজ দূরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কাঠ ও ফলের গাছ। ১০০-১৫০ গজ দূরে ডগ্রী বাজার, ডগ্রী ইসমাইল হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মসজিদ, ডগ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত শতাধিক বসতবাড়ি। ভাটাটি একটি সরিষা খেতের একপাশে ইট ও অন্যপাশে ইট তৈরির মাটি রাখা হয়েছে।

ভাটার পাশেই দিনমজুর আবু তাহের মাদবর ও আব্দুল কাদের হাওলাদারের বাড়ি। তারা বলেন, বাড়ির পাশে ইট ভাটা। প্রতিবাদ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

তারা আরো জানান, ইটের ভাটাটি প্রায় ৮ বছর যাবত এ জমিতে স্থাপন করা হয়েছে। ইট ভাটার চুল্লিটি লম্বায় ছোট হওয়ার কারণে প্রচুর কালো ধুয়া বের হয়। তাই এই আট বছর যাবত আমাদের কোনো গাছেই ফল ধরছে না। ফসলি জমিতেও ধান, সরিষা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই এই ইটের ভাটাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হােক।

প্রতিবেশী নুর মোহাম্মদ খাঁর ভাটার পাশে এক কানি (১৬০ শতাংশ) জমি রয়েছে। সেখানে তিনি প্রতিবছর ধান ও সরিষার আবাদ করেন।

তিনি বলেন, ইটভাটায় জমি দিতে রাজি হইনি। তারপরও খোকন তালুকদার জোর করে জমির পাশে ইটভাটা তৈরি করেছেন। আমরা গরিব তাই আমাদের কথা তারা কানে নেন না।

Shariatpur-Iter-Vata

ডগ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ডগ্রী ইসমাইল হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম, ইতি মন্ডল, জান্নাতুন ফেরদাউস, মিথিলা আক্তার ও রায়হান জানায়, ভাটার কাজ দিয়েই আমাদের বাড়িতে যেতে হয়। ভাটার ধুয়া, আর গাড়ির ধুলার কারণে নাক মুখ বন্ধ হয়ে আসে। মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ি। বিদ্যালয়ে আসি না।
 
ডগ্রী মাদবর কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস ছালাম তালুকদার বলেন, ভাটার সঙ্গে আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এখানে ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়ে যে পথ দিয়ে শিক্ষার্থীরা আসা-যাওয়া করে সেখানে একটি ইটের ভাটা। এই ভাটার চুল্লির কালো ধুয়ায় শিক্ষার্থীরা শ্বাসকষ্ট, কাশি, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তার কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় অনুপস্থিত থাকে। পড়া-লেখা থেকে পিছিয়ে পড়ছে তারা।

নশাসন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বাবুল হোসেন মোল্যা বলেন, ফসলি জমিতে ইট ভাটা তৈরি করা উচিত নয়। তবুও কারো কথা তোয়াক্কা না করে বাবুল ভাটা তৈরি করেছেন। এতে ছাত্র-ছাত্রীদের যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি ফসল এবং গাছপালা নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয় ভাটার ট্রাক ও ট্রলির কারণে ইউনিয়নের সড়কগুলো নষ্ট হচ্ছে।

ন্যাশনাল ব্রিক ফিল্ড (এনবিএম) ভাটার মালিক খোকন তালুকদার ফসলি জমিতে ইটের ভাটার তৈরি হয়েছে এমন কথা অস্বীকার করে বলেন, নিজের ও আত্মীয়দের আশপাশের লোকজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে ৮০০ শতাংশ জমিতে ভাটা করা হয়েছে। কারও জমি জোর করে ভাটার জন্য নেওয়া হয়নি।

খোকন তালুকদার আরো বলেন, আমরা সবাইকে টাকা দিয়ে চলি। আমরা কাগজপত্র ছাড়াই ভাটা চালাই। শিশু শ্রমও করাই। পারলে আপনারা ভাটাটি বন্ধ করেন।

জেলা ইট ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মাদবর ফসলি জমিতে ইটের ভাটার তৈরি হয়েছে এমন কথা অস্বীকার করে বলেন, শরীয়তপুরে ৪০টি ইটের ভাটা আছে। একটা ইট ভাটাও ফসলি জমিতে করা হয়নি।

Shariatpur-Iter-Vata

গোলাম মোস্তফা মাদবর বলেন, ইটের ভাটার মালিকদের বলে দিয়েছি শিশুদের ইটের ভাটায় কাজ করতে দেবেন না। শরীয়তপুরে ভাটায় শ্রমিক পাওয়া যায় না তাই কিশোরগঞ্জ ও রংপুর থেকে ইট ভাটায় কাজ করতে আসে কিছু পরিবার। ওই পরিবারগুলোর সঙ্গে যে শিশুরা আসে তারা ইটের ভাটায় বাবা-মাকে কাজে সাহায্য করে।

এ ব্যাপারে শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. কবির হোসেনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ইটভাটা মালিকদের ফসলি জমিতে ইটভাটা স্থাপন না করতে বার বার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের ফিল্ড অফিসাররা। তাছাড়া কৃষিজমির মাটি বিক্রি থেকে বিরত থাকার জন্যও সব সময় পরামর্শ দিয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।

মো. ছগির হোসেন/এফএ/আরআইপি