ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সবজি চাষে অভাব ঘুচছে সিরাজগঞ্জের কৃষকদের

প্রকাশিত: ০৬:১৪ এএম, ০৫ মার্চ ২০১৭

খাদ্য শস্য ধান উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়া আর অর্থকরী ফসল পাট পচনের পানির অভাবে ধান, পাট, আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে অনেকেই সবজি চাষের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। আবাদি জমি ছাড়াও বাড়ির আঙিনায় আবাদ করছেন মৌসুমী সবজি। সবজি চাষ করে নিজের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অনেকেই বাণিজ্যিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন।  

সবজি চাষ করে অভাব দূর হচ্ছে সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের ২৬টি ইউনিয়নের কৃষকদের। এক সময় তাদের সংসার চলতো ধার-দেনা করে। কিন্তু সবজি চাষের ফলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে চাষিরা অভাব মোচনের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন জেলার কৃষকরা। অল্পসময়ে ফসলের বাম্পার ফলনে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব ফিরে এসেছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৪২ কোটি টাকার শাক সবজি বিক্রি করবে জেলার কৃষকরা।

উক্তরাঞ্চলের শস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত সিরাজগঞ্জে এবার শবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সার ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার কারণে এবার সবজির ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। এ কারণে জেলার হাজার হাজার ক্ষুদ্র্র, বর্গা ও প্রান্তিক চাষি শাক সবজির চাষ করে প্রচুর লাভবান হচ্ছেন। অন্যান্য ফসলের তুলনায় সবজি চাষে বেশি লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের সবজি চাষের দিকেই দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে।  

এ অঞ্চলে চলতি খরিপ-১, খরিপ-২ এবং রবি মৌসুমে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে শাক সবজির আবাদ হয়েছে।

চাষিরা বলেন, এখন শাক সবজি বিক্রির জন্য হাট বাজারে যেতে হয় না। ব্যাপারীরা খেত থেকে শাক সবজি ক্রয় করে নিয়ে যান। এসব ব্যাপারিরা ঢাকা চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে সবজি সরবরাহ করেন।

Vasitable
এছাড়াও খরিপ -১ মৌসুমে ঢেড়স, পটল, চিচিংগা, পুই শাক, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, পানি কুমড়া, চাল কমড়া ইত্যাদি রবি মৌসুমে মুলা, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল শাক, পালং শাক, পুই শাকসহ অন্যান্য সবজি আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন জেলার কৃষকরা। ফলে অনেকেই এখন শাক সবজির আবাদের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন।

এখন জেলার সড়ক মহাসড়কগুলোর পাশে দাঁড়ালে দেখা যায়, বিভিন্ন হাট বাজারের পাশে ট্রাক দাঁড়িয়ে রয়েছে সবজি ক্রয়ের জন্য। রাত থেকে ভোর হতে হতে এসব ট্রাকে সবজি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চলে যাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে সবজি চাষ অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা বেশি করে সবজি চাষের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।

সিরাজগঞ্জ সদর, উল্লাপাড়া, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, কাজিপুর এবং কামারখন্দ উপজেলার গ্রামে গ্রামে এবং চরাঞ্চলে সবজি বেশি চাষ হয়েছে। জেলায় চাষকৃত বিভিন্ন ধরনের সবজির মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, গাজর, শিম, কুমড়া, বেগুন, মুলা, লাউ, এবং বিভিন্ন ধরনের শাকসহ সকল ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে। প্রতিদিনই স্থানীয়ভাবে পিপুলবাড়ীয়া, শালুয়াভিটা, সিমান্তবাজার, বাগবাটি, শিয়ালকোল, ভদ্রঘাট, বহুলী, খোকসাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় সবজির হাট বসে।

এই সব হাট থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাড়রা এসে ট্রাক বোঝাই করে সবজি কিনে নিয়ে যান। এই এলাকার সবজির গুণগত মান ও স্বাদ ভালো হওয়ায় অনেক পাইকাররা সবজি জমি থেকেই নিয়ে যাচ্ছেন। সবজি চাষে জমি থেকে চাসি নগদ অর্থ হাতে নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরেন।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি শস্য চাষ ও উৎপাদনে এবার সিরাজগঞ্জ জেলায় সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার হেক্টর জমি। কিন্তু চাষ হয়েছে ১০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। চাষের লক্ষ্যমাত্রা শত ভাগ ছাড়িয়ে গেছে। উৎপাদনের শুরু থেকেই দামভাল পাওয়ায় সবজি চাষের জমি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সদর উপজেলার শিয়ালকোল এলাকার সবজি চাষি আকবর হোসেন জানান, ইতিপূর্বে সবজি বিক্রি করে ভাল লাভ পেয়েছি। সেই টাকা দিয়ে আবার ক্ষেতে ফুলকপির চাষ করেছি। আগাম সবজি চাষে খরচের তুলনায় দিগুন লাভ হয়। কিন্তু ভরা মৌসুমে সবজির দাম পড়ে যায়। এরকম যদি হয় তাহলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।

Vasitable
নলকা ইউনিয়নের রুস্তম আলী, আকবর আলী সেখ, সোলায়মান হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে বেগুনের আবাদ করেছি। সময় মত ন্যায্য মূল্যে সার-কীটনাশক দিতে পেরেছি। আবহাওয়া ভাল ছিল। একারনে ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। বাজারে সবজির দামও ভাল পাচ্ছি। ৩০-৩৫ টাকা কেজি দরে বেগুন বিক্রি হচ্ছে। খরচ বাদ দিয়ে দ্বিগুন লাভ হবে বলে আশা করছি।

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ধামকৈল গ্রামের কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, গত বছর আমি  জমিতে ইরির আবাদ শেষে সবজির আবাদ করেছিলাম। এতে প্রায় ৭০ হাজার টাকা লাভ করেছিলাম। এবারও ইরির আবাদ শেষে সবজির আবাদ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। আশা করি গত বছরের তুলনাই এবারও লাভবান হবো।

চরদোগামী গ্রামের কৃষক শাহ আলম বলেন, আমার এলাকায় সবাই ঝুঁকে পড়েছে সবজির আবাদ করার জন্য। এবার আমি ৪০ শতক জমিতে বেগুন ও পেয়ারার আবাদ করেছি। এতে আমার ১০ হাজার টাকা খরচ হবে তার পরও আমি ভালো লাভবান হবো।

কামারখন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহিরুল ইসলাম সরকার জানান, গত বছর মৌসুমে উপজেলায় ৭৩ হেক্টরে ফুলকপি ও ৬৬ হেক্টরে বাঁধাকপি চাষ হয়েছিল। এ বছরের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় অতিক্রম করবে।

তিনি বলেন, সঠিক পরিচর্যায় প্রতি হেক্টরে ২৫/৩০ টন ফুলকপি ও বাঁধাকপি উৎপাদন করা সম্ভব। ফুলকপি বড় হচ্ছে। অনেক কৃষক স্থানীয় বাজারসহ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাজারগুলোতে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করছে। সব খরচ বাদ দিয়ে কৃষক লাভের মুখ দেখবে। যার জন্যে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবে।

সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আরশেদ আলী বলেন, অনুকূল আবহাওয়া, সার-কীটনাশকের সহজলভ্যতা ও কৃষি বিভাগের সুষ্ঠু মনিটরিং এর কারণে বিগত কয়েক বছরে তুলনায় এ অঞ্চলে শাক সবজির আবাদ ভালো হচ্ছে। ভালো দামের কারণে কৃষকরা প্রচুর লাভ পাচ্ছেন। এর ফলে শাক-সবজি চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

ইউসুফ দেওয়ান রাজু/আরএআর/পিআর