১ কোটি নারী-শিশুকে নতুন জীবন দিয়েছেন তিনি
বাংলাদেশের আলোকিত নারী অ্যাঞ্জেলা গমেজ। নারী সংগ্রামের জ্বলন্ত এক প্রতিকৃতি। বঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীদের নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছেন তিনি।
অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিতদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাখছেন অগ্রণী ভূমিকা। তার প্রতিষ্ঠান ‘বাঁচতে শেখা’ তিন দশকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি নারী ও শিশুকে নতুন জীবন দিয়েছেন। ১৯৫২ সালে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের মাল্লা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাঞ্জেলা গমেজ।
জীবনের শুরুতে অ্যাঞ্জেলা গমেজ নানা কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করেছেন। বহু বাধা এসেছে তবু দমে যাননি। ১৯৭৪ সালে বিএ পাস করেন তিনি। তখন পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতা করতেন।
ছুটির দিনগুলোতে সহকর্মীদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন যশোর ও ঝিনাইদহের গ্রামগুলোতে। সেখানে দুঃখী ও নির্যাতিত নারীদের জীবনযাপন দেখে অ্যাঞ্জেলা গমেজ তাদের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
১৯৭৬-৭৭ সালে সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও বরিশালে গিয়ে হস্থশিল্পের ওপর নিজে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর যশোর ও ঝিনাইদহের গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারীদের দলবদ্ধ করে সেগুলো শেখাতে শুরু করেন। অবহেলিত, নির্যাতিত নারীরা স্বাবলম্বী হতে শুরু করে। তার হাতেই ১৯৮১ সালে ‘বাঁচতে শেখা’ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়।
অ্যাঞ্জেলা গমেজ তার সংগঠন ‘বাঁচতে শেখা’র মাধ্যমে গ্রামের অসহায় নির্যাতিত গরিব মহিলাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেন।
শিক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বয়স্ক মহিলা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের দিয়ে থাকে। মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিচর্যা প্রকল্পের আওতায় মহিলাদের গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, প্রসূতি সেবা ছাড়া জরুরি চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।
এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের আওতায় শিশুদের ছয়টি মারাত্মক রোগের টিকা প্রদান করা হয়। মহিলাদের ভোট শিক্ষা প্রকল্প, প্রতিবন্ধীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা, হস্তশিল্প, কৃষিক্ষেত্র, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, মৌচাষ, রেশম চাষ, মৎস্য চাষ, ঘূর্ণায়মান ঋণের ক্ষেত্রেও ‘বাঁচতে শেখা’ প্রশংসনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার, লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণে অ্যাঞ্জেলা গোমেজ ও তার বাঁচতে শেখার অবদান দেশে-বিদেশে সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে।
নির্যাতিত-নিপীড়িত নারীর অধিকার রক্ষায় নিজের জীবনের সবকিছুই উৎসর্গ করেছেন তিনি। স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে ‘এশিয়ার নোবেল পুরস্কার’ নামে অভিহিত ফিলিপাইনের ম্যাগসেসে পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে ভারতের কিট বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে।
এছাড়া ১৯৮৮ ও ২০০১ সালে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ সমাজকর্মীর পুরস্কার। ১৯৯৯ সালে বেগম রোকেয়া পদক, ১৯৯৭ সালে পাক্ষিক অনন্যা পুরস্কার, হস্তশিল্পে জাতীয়ভাবে ১৯৮২, ১৯৮৫, ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে স্বর্ণপদকসহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।
অ্যাঞ্জেলা গোমেজ ম্যাগসেসে পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত পুরো অর্থ জমিয়ে রেখেছেন একটি গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। এখানে সুবিধাবঞ্চিতরা বিনা খরচে পড়তে পারবে। এটি তার স্বপ্ন। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বাঁচতে শেখার যে স্বপ্ন অ্যাঞ্জেলা গমেজ আমাদের দেখিয়েছেন সেটি অমূল্য।
আব্দুর রহমান আরমান/এএম/পিআর