ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

দিনাজপুরে বাঙালি ইপিআর প্রথম বিদ্রোহ করে

প্রকাশিত: ১২:৩৩ পিএম, ২৫ মার্চ ২০১৭

৭১’র মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ২৯ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত দিনাজপুরে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে জেলার সাধারণ মানুষ ও তৎকালীন বাঙালি ইপিআররা। যার প্রেক্ষাপটে ১৫ ডিসেম্বর ৭১ পর্যন্ত দিনাজপুরে শক্তিশালী গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

দেশ স্বাধীনের আগে দিনাজপুরে অসংখ্য প্রতিরোধযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। যেসব যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মুক্তিযাদ্ধা শাহজাহান শাহ।

তিনি বলেন, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর থেকে দিনাজপুর কুঠিবাড়ীতে বাঙালি ইপিআর স্বাধীনতার পক্ষে তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে।

একের পর এক গোপন বৈঠকে নেয়া হয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত। এরই মধ্যে দিনাজপুর-দশমাইল রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে চেয়ারম্যান হবিবর রহমানের ছোট ভাই মনু মিয়ানহ মোট ছয়জনকে পাক আর্মি ধরে নিয়ে যায়। পরে তাদের হত্যা করে মরদেহগুলো ফুলতলা শ্মশান ঘাটে নদীর কূলে ফেলে রাখে।

ওই ছয়জনের হত্যাকাণ্ডের পর জনসাধারণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড, টায়ার পোড়ানোর গন্ধ, আগুনের ফুলকি, সোরগোল, স্লোগান, অ্যাকশন, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সব মিলিয়ে অশান্ত শহর। দুর্নিবার এক বিদ্রোহ দাপটের রাজ্য বিস্তার করে গ্রাম-গঞ্জ-শহর সর্বত্র।

যেসব স্থানে যুদ্ধ হয়েছে এর মধ্যে স্মৃতিতে ধরে রাখা কিছু ঘটনা তুলে ধরেন মুক্তিযাদ্ধা শাহজাহান শাহ। একাত্তরের সেই দিনগুলোতে সংঘঠিত কয়েকটি স্থানের যুদ্ধের চুম্বকাংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

কুঠিবাড়ী : তৎকালীন দিনাজপুর জেলা সদরের ইপিআর হেডকোয়ার্টার থেকে ২৮ মার্চ ১৯৭১ বাঙালি ইপিআর প্রথম বিদ্রোহ করে। সেদিন ইপিআর আর বাঙালি মিলে কুঠিবাড়ী দখলে নেয়। সেখান থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে যায়। এখানে গোলাগুলিতে কয়েকজন নিহত হয়। সেখান থেকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা।

দিনাজপুর সার্কিট হাউজ : ১৯৭০ সালের নির্বাচনকালীন সময় থেকে দিনাজপুর সার্কিট হাউজ ছিল পাকসেনাদের সশস্ত্র ঘাঁটি। এছাড়া এটি পাকসেনাদের ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

দশমাইল : কাহারোল উপজেলার অধীনে এটি একটি ত্রিমুখী রাস্তার সংযোগ স্থল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি ইপিআর ও দিনাজপুরের জনগণ সৈয়দপুর সেনাঘাঁটির আক্রমণ একটি শক্তিশালী ডিফেন্স তৈরি করে প্রতিহত করেন। এছাড়া নভেম্বর মাসের শেষ ও ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ভুষির বন্দর ব্রিজ : দিনাজপুর-সৈয়দপুরের একমাত্র সংযোগ সেতু এখানে পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এখানে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

মোহনপুর ব্রিজ : দিনাজপুর সদর থেকে ফুলবাড়ী যাওয়ার পথে আত্রাই নদীর ওপরের সেতুটি চলাচলের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাকসেনাদের হাতে মোহনপুর সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি সংঘর্ষ হয়।

ভাতগাঁও : দিনাজপুর-বীরগঞ্জ সড়কে এটি অবস্থিত। এই গ্রামের পাশে ঢেপা নদীর ওপর বিখ্যাত ভাতগাঁও সেতু। এখানে ১৯৭১ সালের ১৫ ও ১৬ নভেম্বর পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সরাসরিযুদ্ধ সংঘটিত হয়।

কাঞ্চন সেতু : দিনাজপুর রেলস্টেশন থেকে বিরল রেলপথে কাঞ্চন নদীর ওপর বহু পুরাতন ও একমাত্র সেতু। ৭১ সালের জুলাই ও ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখমুখি লড়াই হয় এবং ১৩ ডিসেম্বর পালিয়ে যাওয়ার সময় পাকসেনারা সেতুটি ধ্বংস করে দেয়।

বহলা গ্রাম : ১১ ডিসেম্বর পাকবাহিনী বিরলে এই গ্রামে ৩৬ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ গ্রামের একটি গণকবর তারই প্রমাণ বহন করে। বিরলে মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি সফল গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে।

খানসামা : এখানে পাকসেনারা একটি শক্তিশালী ঘাঁটি তৈরি করে। ১৫ ডিসেম্বর ৭১ মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যোথভাবে পাকসেনাদের পরাজিত করে।

বীরগঞ্জ : পাকসেনাবাহিনী ও তার দোসররা নির্বিচারে নির্যাতন ও গণহত্যা চালায়। উপজেলার মোহনপুর ও দেবীপুর মৌজায় বধ্যভূমি ও গণকবর রয়েছে। ৫ ও ৬ ডিসেম্বর এখানে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

কাহারোল : এই উপজেলায় পাকসেনা ও তার দোসররা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এখানে বেশ কয়েকটি গণকবর রয়েছে। এ থানার কান্ত নগরে যৌথবাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল।

চিরিরবন্দর : এই উপজেলায় ৭১ এ নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বেম কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এখানে কয়েকটি গণকবর রয়েছে।

ফুলবাড়ী : উপজেলায় আখিরা নামক স্থানে পাকসেনারা রাজাকারদের সহযোগিতায় ভারতে পার করে দেয়ার নাম করে ডেকে নিয়ে গণহত্যা চালায়। এখানে একটি বধ্যভূমি রয়েছে। এছাড়া নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ পর্যন্ত কয়েকটি সফল যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

হাকিমপুর : এই উপজেলায় হিলি বর্ডারকে কেন্দ্র করে পাকসেনাবাহিনী একটি উল্লেখযোগ্য ডিফেন্স তৈরি করে। ৭১’র ২০ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১২ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী হিলি বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
 
মুক্তিযাদ্ধা শাহজাহান শাহ আরও বলেন, দিনাজপুরের নিউটান, পুলিশ লাইন, টেলিফোন অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায়  খানসেনাদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর অসংখ্য সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়।

১৩ এপ্রিল পাকবাহিনী দিনাজপুর পুনরায় দখলকালে অমানবিক অত্যাচার চালায়। শহরের টেলিফোন ভবনে খান সেনারা অনেক লোককে হত্যা করে। তারা বীরগঞ্জ ও সেতাবগঞ্জ চিনি কলে হাজার হাজার লোককে হত্যা করে।

এমদাদুল হক মিলন/এএম/আরআইপি