ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. দেশজুড়ে

সেদিন পদ্মার চরে গিয়ে আশ্রয় নেয় সবাই

প্রকাশিত: ০২:২১ পিএম, ২৮ মার্চ ২০১৭

সারা দেশের অধিকাংশ এলাকা ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত হলেও পাবনা ছিল ব্যতিক্রম। অর্থাৎ পাবনা মুক্ত হয় দুবার। ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা পুরোপুরি মুক্ত ছিল।

হানাদার বাহিনী ’৭১’র ২৬ মার্চ পাবনায় প্রবেশের পর মুক্তিকামী জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সবাইকে হত্যা করে। এ হত্যার পর ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা ছিল পুরোপুরি মুক্ত এলাকা।

এরপর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয় করে ১১ এপ্রিল থেকে পাবনায় হত্যাযজ্ঞ এবং অগ্নিসংযোগসহ নারকীয় তাণ্ডবে মেতে ওঠে।

পাবনার মুক্তিযোদ্ধা বেবী ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে সারাদেশে পাকহানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালালেও তারা পাবনায় প্রবেশ করে ২৬ মার্চ ভোর সাড়ে ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে।

এক কোম্পানি সেনা পাবনায় সার্কিট হাউস, ওয়াপদা এবং পুরাতন টেলিফোন ভবনে এসে ক্যাস্প স্থাপন করে। এরপর ২৬ মার্চ সকাল থেকে পাবনা শহরে তারা কারফিউ জারি করে। তারা ২৬ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত শহীদ আমিন উদ্দিন, ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, সাইদ তালুকদারসহ অনেকে বন্দি করে নিয়ে এবং তাদের হত্যা করে।

এদিকে, পাকবাহিনী পাবনায় আসার পর পরই মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাই পাবনা ছেড়ে পদ্মার চরে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই পাকবাহিনীকে নির্মূল করার পরিকল্পনা করা হয়।

সেখানে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুল, আব্দুর রব বগা মিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ চলে যান। এদের সঙ্গে পাবনার তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম নুরুল কাদের খান (স্বাধীনতার পরে তিনি ঘুণাভরে খান উপাধী পরিত্যাগ করেন) সরকারি বাংলো ছেড়ে যোগ দেন।

মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম বিশু বলেন, ২৬ মার্চ থেকে পাকবাহিনী কারফিউ’র মধ্যেই অনেককে হত্যা করে এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এরই মধ্যে নেতৃবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধারা চরে সংগঠিত হতে থাকেন।

তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ মানুষ। দেশি অস্ত্রশস্ত্রসহ যার কাছে যা ছিল তারা তা নিয়ে ২৮ মার্চ পাবনায় টেলিফোন ভবনে পাকবাহিনীর ওপর হামলা করে। পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার ভেঙে জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে যায়।

pabna

পাকবাহিনী পুলিশ লাইনে প্রবেশ করে জনতার ওপর হামলার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা টিকতে না পেরে টেলিফোন ভবনে গিয়ে পজিশন নেয়। এই টেলিফোন ভবনে মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালিয়ে তাদের হত্যা করে।

এদিকে, পাবনায় আটকে পড়া বা আক্রমণের শিকার পাকসেনাদের উদ্ধার করতে রাজশাহী থেকে এক মেজরের নেতৃত্বে কিছু সেনা পাবনায় আসলে তারাও আক্রমণের মুখে পড়ে। এখানেই তাদের মৃত্যু হয়। এভাবে পাবনায় প্রথম দফায় আসা আনুমানিক ১৫০ পাকসেনা খতম হয়।

২৮ মার্চ পাবনা হানাদার মুক্ত হওয়ার পর পুরো শহরে জনতা উল্লাস করতে থাকে এবং ২৯ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা হানাদার মুক্ত বা মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়।

কিন্তু পরাজয়ের এই গ্লানি হানাদার বাহিনী সহ্য করতে পারেনি। ১১ এপ্রিল তারা রাজশাহী এবং নগরবাড়ি ঘাট দিয়ে বিপুল শক্তি সঞ্চয় করে এখানে প্রবেশ করে। পরে নগরবাড়িসহ একে একে সব এলাকার পতন হয়।

পাবনা দ্বিতীয় দফায় পাকহানাদার বাহিনীর দখলে চলে যায় ১১ এপ্রিল থেকে। এরপর ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৮ ডিসেম্বর পাবনা মুক্ত হয়।

সারা দেশে ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত হলেও পাবনায় অবস্থানরত পাকবাহিনী মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় দুদিন দেরি হয়।

ফলে ১৮ ডিসেম্বর পাবনা মুক্ত হয়। আর ১৮ ডিসেম্বর পাবনা মুক্ত দিবস পালিত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক-হানাদার মুক্ত হয় পাবনা সদর উপজেলা।

দীর্ঘ নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাবনায় প্রায় পাঁচ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ শহীদ হন। জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্জয় পাবনা নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।

একে জামান/এএম/এমএস